ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

লক্ষ্মীপুরে ড্রাগন চাষে সফল তরুণ ইঞ্জিনিয়ার

উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তারা

লক্ষ্মীপুরে ড্রাগন চাষে সফল তরুণ ইঞ্জিনিয়ার
×

ছবি: সমকাল

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৩:২৬

একসময় যে ড্রাগন ফল ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সেই ফল এখন ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে লক্ষ্মীপুরের মাটিতে। করোনাকালে শুরু করা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনীমোহন এলাকার তরুণ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার মাজহারুল ইসলাম নাঈমের একটি উদ্যোগ আজ স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তার এই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো জেলাজুড়ে কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। 

করোনাকালে যখন দেশের বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন, তখনই কৃষিকে সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন নাঈম। মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিজের জন্য নতুন কিছু করার প্রত্যয় থেকে ২০২১ সালে ৩২০ শতাংশ লিজকৃত জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে অনেকেই তার সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই উদ্যোগই এখন সফলতার গল্প হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চররমনীমোহনের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি ড্রাগন গাছ। গাছজুড়ে ঝুলছে লাল পাকা ফল। এক সময়ের পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমি এখন সবুজে ভরপুর।  

উদ্যোক্তা মাজহারুল ইসলাম নাঈম বলেন, করোনার সময় দেখেছি অনেক মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে গেছেন। তখন ভাবতে শুরু করি, কৃষির মাধ্যমে এমন কিছু করা যায় কি না, যাতে নিজের পাশাপাশি অন্য মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। আমি ইউটিউবে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন ভিডিও দেখতাম। সেখান থেকেই ড্রাগন চাষ সম্পর্কে জানতে পারি। পরে সাহস করে বাগান শুরু করি। 

তিনি বলেন, শুরুতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। এ এলাকায় আগে ড্রাগন চাষ খুব একটা হতো না। ফলে অনেক বিষয় নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়েছি, বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেছি। ধীরে ধীরে সফলতা এসেছে। 

নাঈমের দাবি, তার বাগান দেখে অনেক তরুণ কৃষিতে আগ্রহী হয়েছেন। 

তিনি বলেন, এখন আমার বাগান দেখে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ নিয়ে লক্ষ্মীপুরের অনেক তরুণ ড্রাগন চাষে এগিয়ে আসছেন। অনেকে বেকারত্ব কাটিয়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন। শুধু নিজেরাই আয় করছেন না, অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছেন। এটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। 

চররমনীমোহন এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, আগে ড্রাগন ফল কিনতে গেলে অনেক টাকা খরচ হতো। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হওয়ায় সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। দামও অনেক কমে এসেছে। 

একই এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, নাঈমের সফলতা দেখে আমরা অনেকেই ড্রাগন চাষে আগ্রহী হয়েছি। কৃষি যে লাভজনক হতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ তিনি। 

স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ড্রাগন ফল প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ কয়েক বছর আগে একই ফলের দাম ছিল এক হাজার থেকে বারোশ টাকা পর্যন্ত। 

লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী বাজারের ফল ব্যবসায়ী মো. সোহেল বলেন, আগে ড্রাগন ফল ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আনতে হতো। পরিবহন খরচ বেশি ছিল। এখন স্থানীয় বাগান থেকেই ফল পাওয়া যায়। ফলে সরবরাহ বেড়েছে এবং দামও কমেছে। 

চাষিরা জানান, ড্রাগন চাষে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় আগাছা পরিষ্কার ও নিয়মিত পরিচর্যায়। তবে অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় এতে রোগবালাই কম দেখা যায়। সঠিক পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। ফল ধরার ২০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই তা সংগ্রহ করে বাজারজাত করা যায়।

মাজহারুল ইসলামের বাবা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ছেলের উদ্যোগে শুরু থেকেই আমি সহযোগিতা করেছি। আমরা যতটা সম্ভব রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই ড্রাগন উৎপাদনের চেষ্টা করছি। ফলের গুণগত মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বাড়ছে। 

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ড্রাগন চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। পাশাপাশি তরুণদের কৃষিমুখী করে বেকারত্ব কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন বলেন, ড্রাগন ফলের রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং এর বাজারমূল্য ভালো। পর্যাপ্ত রোদ পেলে সহজেই চাষ করা যায়। ড্রাগন ফল বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেছে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকলে সহজেই এর চাষ করা সম্ভব। বর্তমানে অনেক কৃষক এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এমনকি বাড়ির ছাদেও ড্রাগন চাষ করা সম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ্মীপুরে ড্রাগন চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসায় এ ফলের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন কৃষকদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ফল। 

আরও পড়ুন

×