ঢাকা রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

সরকারের ১০০ দিনে খুন, অপহরণ বেড়েছে

সরকারের ১০০ দিনে খুন, অপহরণ বেড়েছে
×

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ২০:৪৭ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ২২:০৩

সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। তবে কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনার মতো সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। 

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক মো. জুলকারনাইন।

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিল দুই মাসে দেশে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। 

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা, টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও সহিংস অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়ে গেছে।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত দুই মাসে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬টি।

এ ছাড়া ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৯ থেকে ৭১টি।

গণপিটুনি ও মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান ও নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। মার্চ ও এপ্রিলে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন।

এ ছাড়া কারা হেফাজতে ১৪ থেকে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে আহত হয়েছেন পাঁচজন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন একজন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাতজন এবং দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে তিনটি।

টিআইবি বলছে, বিভিন্ন স্থানে মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ার জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে উদ্বেগজনক হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকার অপরাধে ৪০ শতাংশ কিশোর

প্রতিবেদনে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। টিআইবি বলছে, রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোর। বিভিন্ন অপরাধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।

সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ

প্রতিবেদনে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা, পর্যায়ক্রমে মাঠ থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশের ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত।

‘দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থানে’

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশা জাগানিয়া ও সম্ভাবনাময় হলেও অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তা উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা কার্যকর করার জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থান নিয়েছে। কমিশন থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাসেও কমিশন গঠন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর।

তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগও যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।

‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন ও দুর্নীতি দমনের ঘোষণা থাকলেও প্রশাসন, ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠীগত বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত রয়েছে।

টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল বা স্থগিত করায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

টিআইবির মতে, এসব সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে পেছনে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি

শিক্ষা খাত নিয়ে পর্যবেক্ষণে টিআইবি জানিয়েছে, সরকার গঠনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।

সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দলীয় বিবেচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন ব্যক্তিকেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষা খাতে উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন ও প্রভোস্ট পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিবর্তন, পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

তবে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটির পুনর্গঠন, প্রতি বছর পুনঃভর্তি ফি বাতিল, লটারির পরিবর্তে পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি, প্রতিবন্ধী শিশুবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সুশাসনের ঘাটতি দূর করার আহ্বান

সার্বিক মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করলেও সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অভাব, দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক কৌশলের অভাব সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সংস্থাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

×