এস আলমের গাড়ি ব্যবহার বিষয়ে সংসদে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০১:৫১
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্য এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিরোধী দল। প্রস্তাবটি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে সরকারি দল। এস আলমের গাড়ি ব্যবহার বিষয়ে জামায়াতের এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যে গাড়ির কথা বলা হচ্ছে, তা কোনো ব্যক্তির নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গাড়িটি নিবন্ধন করা। তাতে আমার সমর্থকরা তুলেছেন। এ জন্য আমি আগেও জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাবটি (সাধারণ) আনেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। প্রস্তাবে ‘দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সমস্যা সমাধান, তাদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী ও টেকসই করা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থের বিষয়ে আলোচনা’র কথা বলা হয়।
প্রস্তাবের ওপর এক ঘণ্টা ২০ মিনিটের সাধারণ আলোচনায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মোট ৯ জন সদস্য অংশ নেন। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এত বছরের সংসদীয় জীবনে কখনও বিরোধী দলকে এমন প্রস্তাব আনতে দেখেননি। প্রস্তাবের জন্য বিরোধী দলের নেতাকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, প্রস্তাবটি এনে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদকে প্রাণবন্ত করেছেন।
এর আগে, জামায়াতের সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি বক্রোক্তি করে বলেন, ‘আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুমের পর ভারতে প্রবাসী ছিলেন। সবার তো উনার মতো কপাল হয় না। উনি দেশে বীরোচিত সংবর্ধনা পেয়েছেন। এস আলমের গাড়ি ব্যবহার করেন। আমি সেদিকে যেতে চাই না। গতকাল (গত মঙ্গলবার) তিনি এস আলমের পক্ষে বলেছেন। যার নুন খেয়েছেন, তার গান গেয়েছেন। সেদিকে যেতে চাই না।’
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার চারটি গাড়ি আছে। চারজন চালক আছে। খুব একটা গরিব মানুষ না। বিদেশ থেকে আসার পর এলাকায় লাখ লাখ মানুষ সংবর্ধনা দিয়েছেন। সমর্থকরা একেকটি গাড়িতে তুলেছেন। যে গাড়ির কথা বলা হচ্ছে, তা কোনো ব্যক্তির নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে গাড়িটি নিবন্ধন করা। তাতে আমার সমর্থকরা তুলেছেন। এ জন্য আমি আগেও জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি।’
টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি যদি খুব দ্রুত গঠন করা যায়, অনেক বিষয় আলোচনা করেও সমাধান করা যাবে; অনেক অভিযোগেরও নিষ্পত্তি করা যাবে। তবে টাস্কফোর্স সম্পর্কিত যে প্রস্তাবটা দিয়েছেন, তা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পারে। আমার মনে হয়, টাস্কফোর্স প্রতিষ্ঠা করা যায়।’
শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর নির্ধারিত হয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার জন্য তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। আগে মন্ত্রী ও উপদেষ্টাকে পাঠিয়েছেন শ্রমবাজার খুলতে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা অভিবাসনকে কলঙ্কিত করেছে, কিছু ক্ষেত্রে মানব পাচারও হয়েছে; এর বিচারে কয়েক দিন আগে ১০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা শুধু সম্মান এবং কাজের পরিবেশ চান। প্রধানমন্ত্রী যেন শুধু আর্থিক রেমিট্যান্স নয়, ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্সকেও গুরুত্ব দেন। প্রবাসীদের উত্তরাধিকারে সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। পাসপোর্টে নানা ভুলের কারণে হাজার হাজার প্রবাসী অবৈধ হয়ে পড়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৭৩টি মিশনের ৭১টিতে ই-পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। পাসপোর্ট সংশোধন আবেদন করা যাচ্ছে জন্মনিবন্ধন সনদের মাধ্যমে। পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে।
লিবিয়াতে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা যে মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
প্রবাসীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্পের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, দূতাবাসে যে ধরনের অ্যাপ্রোচ দরকার, সেটা অনেক ক্ষেত্রে হচ্ছে না। উচ্চ পর্যায়ের সফর হলে কিছু দরজা খুলবে।
বিরোধী দলের অভিযোগ নাকচ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সরকার প্রবাসীদের ধারণ করে; প্রত্যেক রেমিট্যান্স যোদ্ধার সমস্যা মানবিকভাবে দেখে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো অভিবাসন উইং খুলেছে। বাংলাদেশিরা বৈধ বা অবৈধ– যেভাবেই বিদেশে যাক, মন্ত্রণালয় তা দেখছে। ইউরোপের পথে লিবিয়ায় দালাল ও জিম্মির ঘটনা রয়েছে। দালাল চক্রকে ধরতে না পারা পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রীদের সমালোচনা করে বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, লোটাস কামালের মতো দানবদের কারণে প্রবাসীদের এই অবস্থা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের জন্য দায়ী সিন্ডিকেট। সব সরকারের আমলে সিন্ডিকেট হয়। এই সরকারের সময়ে হবে না, আশা করি। ইউরোপে কর্মীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় বন্ধে দূতাবাসগুলোর কোনো ভূমিকা আজ পর্যন্ত দেখিনি। মন্ত্রণালয় হয়েছে, বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে। তারা কী কাজ করে ? কূটনীতিকদের একদিন সংসদে ডাকেন। তাদের প্রশ্ন করি, তারা করে কী?
এই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, সব যখন ধরেছেন, এদেরও ধরেন। এই সময় হাসির রোল পড়ে সংসদে।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব সফরের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, সৌদি আরবে সবচেয়ে নিম্নমানের কাজ করেন বাংলাদেশিরা। ৪০০ রিয়ালে চাকরি করেন। তাদের সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে পাঠিয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এজেন্সি। এই যে টাকা লুটপাট হয়েছে, এর জন্য মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসকে তদন্ত করতে হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী বলেন, এই অর্থবছরে ৩২ বিলিয়ন ডলার এসেছে। রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে। বিনিয়োগ করতে হবে। প্রবাসীদের ন্যাশনাল প্রসপার পার্টনার (এনপিপি) ঘোষণার প্রস্তাব করেন তিনি। প্রবাসী বন্ড, বিনিয়োগ সুবিধা চালুরও দাবি জানান।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, নির্বাচন এলে মঞ্চে ভাষণে বলি– প্রবাসীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যায়, বিমানবন্দরে ব্যাগ কেটে তাদের নিঃস্ব করা হয়। ভিসার নামে তাদের নিঃস্ব করা হয়। ভুয়া চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠানো হয়। কাজ না পেয়ে না খেয়ে রাস্তায় মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের দূতাবাসে একবারও দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি।
- বিষয় :
- এস আলম
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- সালাহউদ্দিন আহমেদ
