ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবল

গ্রামে উৎসবের আমেজ নষ্ট হতে পারে লোডশেডিংয়ে

অন্য বিতরণ সংস্থার চেয়ে পল্লী বিদ্যুতে ভোগান্তি বেশি

গ্রামে উৎসবের আমেজ নষ্ট হতে পারে লোডশেডিংয়ে
×

 হাসনাইন ইমতিয়াজ 

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ১১:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে এখন বাংলাদেশের সর্বত্র উৎসবের আমেজ। চায়ের দোকান থেকে অফিস কি অলিগলি– সবখানেই চলছে প্রিয় দলের পতাকা টানানো, জার্সি কেনা আর খেলা নিয়ে চিরচেনা তর্ক-বিতর্ক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শঙ্কাও। কারণ, খেলা চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকলে সব উৎসব ম্লান হয়ে যাবে।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকট নেই। জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট, আর গড় লোডশেডিং ছিল ২০০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি সংসদে দাবি করেছেন, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই; যা হচ্ছে তা মূলত বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা কারিগরি ত্রুটি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র সরকারি এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে গ্রাহকদের অভিযোগ, দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকছে না। ফলে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো নির্বিঘ্নে উপভোগ করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন গ্রামের দর্শক।

অবশ্য ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িক মেরামতে থাকায় সামান্য কিছু এলাকায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হচ্ছে। তবে খেলা শুরুর আগেই এসব কেন্দ্র চালু করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। ফুটবল বিশ্বকাপের বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি।’

খেলার সময় চ্যালেঞ্জ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
আজ ১১ জুন শুরু হয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে এই বিশ্বমঞ্চে। তবে বাংলাদেশের দর্শকের জন্য এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ম্যাচের সময়সূচি। ভৌগোলিক সময়ের পার্থক্যের কারণে অধিকাংশ ম্যাচ শুরু হবে বাংলাদেশ সময় গভীর রাত, ভোররাত কিংবা সকালে। ফলে টেলিভিশন কিংবা অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের ওপর নির্ভরশীল দর্শকের জন্য এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রীষ্মকালীন চাহিদা সামাল দিতে দেশে প্রতিদিন ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।

এলাকাভেদে লোডশেডিংয়ের সময়-স্থায়িত্ব ভিন্ন
বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে উৎপাদন ঘাটতির চেয়ে বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে পল্লী বিদ্যুতের ওপর। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আরইবি ও এর আওতাধীন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন এবং গ্রামীণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ঝড়-বৃষ্টি বা কারিগরি ত্রুটির প্রভাবও এখানে বেশি দেখা যায়।

গত রোববার রাত ১০টা থেকে পরদিন সোমবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন জেলার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরবরাহ বিঘ্নের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি এসেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলো থেকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, নবীনগর ও বিজয়নগরে কয়েক ঘণ্টা থেকে রাতভর বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোলার গ্রামীণ এলাকায় কোথাও দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার দাবি করেছেন গ্রাহকরা। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬-১৮ ঘণ্টা, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে প্রায় ১৩ ঘণ্টা এবং জয়পুরহাটের কালাইয়ে সাত ঘণ্টা আট মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এ ছাড়া বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

অন্যদিকে, শহরভিত্তিক বিতরণ কোম্পানিগুলোর এলাকায় তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। নেসকোর আওতাধীন সিরাজগঞ্জ শহর, ওজোপাডিকোর আওতাধীন ভোলা শহর কিংবা আশুগঞ্জ, চাঁদপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঝালকাঠি, গাইবান্ধা ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বেশি লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়নি।
মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকো বা ওজোপাডিকোর তুলনায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামীণ এলাকাগুলোতেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছে মানুষ। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ এগুলোকে লোডশেডিং নয়; বরং ঝড়-বৃষ্টি, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়া বা লাইন মেরামতের কারণে সৃষ্ট সাময়িক বিভ্রাট হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা মূল বাধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও বিতরণ ও উপকেন্দ্রভিত্তিক অবকাঠামোর দুর্বলতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতের বিস্তৃত ও দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনে ঝড়-বৃষ্টি বা যান্ত্রিক ত্রুটি হলেই পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ভেঙে পড়ে। ফলে জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা গ্রামীণ গ্রাহকের ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

শঙ্কার মুখে কোটি মানুষের আবেগ
বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সরাসরি ম্যাচগুলো সম্প্রচার করবে। বিটিভির ফিড নিয়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটরগুলো অ্যাপের মাধ্যমে খেলা দেখাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন জনবহুল মোড়ে বড় পর্দায় ম্যাচ প্রদর্শনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তবে এসব আয়োজনের সাফল্য নির্ভর করছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ ও উৎসব। আর সেই উৎসবের ক্ষণে যদি বারবার লোডশেডিংয়ের অন্ধকার নেমে আসে, তবে তা হবে হতাশাজনক। ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন– বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর সময়ে আলো থাকবে তো? 

 

আরও পড়ুন

×