চার বছর পর শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ
ছবি : সমকাল
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৫:৩৯
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে যে কোনো দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ সব সময় কম। বিগত এক দশকে প্রস্তাবিত অধিকাংশ বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশের নিচে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোনো অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে ২ শতাংশ বা এর একটু বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমে আরও নিচে নেমে আসে।
শিক্ষা খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জানিয়ে আসছিলেন। তারা বরাবরই এ খাতে জিডিপি অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ে দুর্নীতি রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের তাগাদা দেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মেনে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে চার বছর পর এই খাত আবারও জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ পেল। একই সঙ্গে এ বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর ফলে নতুন বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে মোট এক লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এ দুই মন্ত্রণালয়ের তিন বিভাগে মোট ৮৫ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল, সংশোধিত বাজেটে সেই বরাদ্দ কমিয়ে ৩১ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ বিভাগে ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৪১ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল।
শিক্ষার বাকি দুই খাতের মতো কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বিভাগে ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ১২ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। অবশ্য এবারের বাজেট শিক্ষকদের কোনো দাবি পূরণের উদ্যোগ নেই। নন-এমপিও শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের কোনো প্রতিশ্রুতি বাজেট প্রস্তাবে নেই।
স্থাপন হবে ৫০০ ভাষা ল্যাব
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রসারে পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম প্রণয়ন এবং দেশজুড়ে ৫০০টি ভাষা ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাজেটের শিক্ষা খাত-সংক্রান্ত বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম প্রণয়ন করা হবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য তৈরি করা হবে পাঁচটি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ মডিউল। পাশাপাশি ভাষা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ শিক্ষক গড়ে তুলতে একটি রিসোর্স পুলও গঠন করা হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখার ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়াতে স্থাপন করা হবে ৫০০টি ভাষা ল্যাব।
২৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি শিক্ষায় একাধিক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরিবেশ সংরক্ষণ ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বাড়াতে নতুন একটি উদ্যোগ হিসেবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ সমকালকে বলেন, এতদিন শিক্ষায় বরাদ্দ উল্টো দিকে যাচ্ছিল। এবার বরাদ্দ বেড়েছে। এটা শিক্ষা খাতে ভালো বার্তা। তবে মূল সমস্যা হলো, বাজেটকে কাজে লাগানো। সরকার বাড়তি টাকা কীভাবে কাজে লাগাবে, সেটা দেখার বিষয়। যদিও সরকার বিচ্ছিন্নভাবে কারিকুলামে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষক, কারিকুলাম সংস্কারসহ নানা উদ্যোগের কথা বলছেন। এটা কতটা বাস্তবায়ন হবে তার কোনো রূপরেখা নেই। ফলে বাজেটের পুরো টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
