ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

বাজেটের চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ রাজস্ব ও সুশাসন

বাজেটের চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ রাজস্ব ও সুশাসন
×

ড. সেলিম রায়হান

ড. সেলিম রায়হান

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:২৮ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১১:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতা থেকে শুরু করেছে, কিন্তু স্থিতিশীলতা ও সম্প্রসারণের মধ্যকার টানাপোড়েন পুরোপুরি সমাধান করতে পারেনি। 
বাজেটে দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয় এবং বহিঃখাতের অভিঘাতের ঝুঁকিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চতর বিনিয়োগ, সামাজিক খাতে বেশি ব্যয়, বিস্তৃত কর-প্রণোদনা, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়, কিন্তু এগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন দরকার। 

সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমানো হবে, কর ছাড় বাড়ানোর পরও কীভাবে রাজস্ব আয় বাড়বে, অথবা ঋণের কঠোর শর্ত ও আস্থায় দুর্বল থাকা অবস্থায় কীভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে– বাজেটে যথেষ্ট স্পষ্ট করে বলা হয়নি। জিডিপির ৩.৬ শতাংশ ঘাটতি ব্যবস্থাপনাযোগ্য এবং ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ কিছুটা কমানোর প্রস্তাবও সতর্কতামূলক। তবু সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হতো, যদি এতে বাস্তবায়ন-সূচক, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব বণ্টন এবং জ্বালানি, বিনিময় হার ও রাজস্ব ঝুঁকির জন্য বিকল্প পরিকল্পনা আরও স্পষ্টভাবে থাকত।
রাজস্ব কৌশলই হবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জিডিপির ৭ শতাংশের নিচে কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে বাংলাদেশ আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, জলবায়ু সহনশীলতা এবং শিল্প রূপান্তরে অর্থায়ন করতে পারবে না– বাজেট এটি স্বীকার করেছে। পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ছাড় পর্যালোচনা এবং করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করার প্রস্তাবও দিয়েছে। এগুলো যুক্তিসংগত সংস্কার। 

কিন্তু একই বাজেটে বিস্তৃত বিনিয়োগ প্রণোদনা প্যাকেজও দেওয়া হয়েছে। করপোরেট করহার স্থিতিশীল রাখা, বৈদেশিক ঋণের সুদ ও যন্ত্রপাতি লিজিংয়ের ওপর কর হ্রাস, ফ্রি ট্রেড জোন, অফ-ডক ও আইসিডিতে বিদেশি মালিকানার সীমা শিথিল করা এবং লজিস্টিকস, বন্দর, টার্মিনাল ও এয়ার কার্গো বিনিয়োগের জন্য নতুন বিধান দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থা ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও অর্থায়ন ব্যয় কমাতে পারে। এগুলো একটি জরুরি সত্যও স্বীকার করে– রপ্তানি প্রতিযোগিতা শুধু কারখানার দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; কাস্টমস, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, বন্দর এবং লজিস্টিকসও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
খাতভিত্তিক প্রণোদনাগুলো ভবিষ্যৎমুখী। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল পণ্য, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার, এসএমই, নারী উদ্যোক্তা এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগের জন্য কর ও শুল্ক ছাড় থেকে বোঝা যায়, সরকার আর্থিক নীতিকে কাঠামোগত রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছে। তবে কর-প্রণোদনা একা প্রতিযোগিতামূলক শিল্প তৈরি করতে পারে না। সৌরবিদ্যুৎ, ইভি, ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর এবং উন্নত ইলেকট্রনিকসের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ শ্রমশক্তি, পরীক্ষাগার, মান অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, অর্থায়ন এবং বাজার চাহিদা প্রয়োজন। এসব শর্ত ছাড়া প্রণোদনাগুলো প্রকৃত শিল্পোন্নয়নের বদলে আমদানিনির্ভর সংযোজন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজের ক্ষেত্রে বিস্তৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বদলে ডিজাইন সার্ভিস, টেস্টিং, প্যাকেজিং বা ইলেকট্রনিকস-সংযুক্ত উপাদান উৎপাদনের মতো বাস্তবসম্মত অবস্থান নির্ধারণ দরকার।

ব্যয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ভালো উদ্যোগ। মানবসম্পদে দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ বিবেচনায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যা সমাধান হবে না। প্রকৃত দুর্বলতা রয়েছে বাস্তবায়নের গুণমান, ক্রয় প্রক্রিয়ার শৃঙ্খলা, স্থানীয় পর্যায়ের সেবা প্রদান এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলে। খেলাপি ঋণ ও পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় আর্থিক খাতের সংস্কারও জরুরি। তবে সুশাসন সংস্কার ছাড়া পুনঃমূলধনীকরণ হলে বেসরকারি ব্যর্থতার বোঝা রাষ্ট্রীয় ব্যালান্স শিটে স্থানান্তরিত হতে পারে। 

সামগ্রিকভাবে বাজেটে কিছু আশাব্যঞ্জক দিক আছে, কিন্তু এটি এখনও বাস্তবায়ন-কৌশলের চেয়ে অভিপ্রায়ে বেশি ভারী। সাফল্য নির্ভর করবে নজরদারিযোগ্য সংস্কার-সূচক, স্বচ্ছ কর-ব্যয় হিসাব, প্রণোদনার সময়সীমা এবং কর ছাড়ের সঙ্গে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদনশীলতা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের দৃঢ় সংযোগের ওপর। 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

 


 

আরও পড়ুন

×