মাটির নিচে ফুরিয়ে যাচ্ছে পানি, শুকাচ্ছে বরেন্দ্র
বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৯:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্রভূমি ধীরে ধীরে ভয়াবহ পানি সংকটের দিকে যাচ্ছে। যে ভূগর্ভস্থ পানি কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের কৃষিকে টিকিয়ে রেখেছিল, সেই পানির স্তর এখন দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপে আর আগের মতো পানি উঠছে না। কোথাও কোথাও ২০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছে পানির স্তর।
খাওয়ার পানির জন্য গ্রামবাসীকে শত শত মিটার দূরে যেতে হচ্ছে। সেচের অভাবে অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এই পটভূমিতে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মরূকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস।
দ্রুত নামছে পানির স্তর
বরেন্দ্র অঞ্চলে তুলনামূলক কম ও অনিয়মিত বৃষ্টি হয়। কয়েক দশকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। আশির দশক থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে। ফলে একসময় খরাপ্রবণ এই অঞ্চলে বোরো ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজির আবাদ শুরু হয়। তবে সেই সাফল্যের পেছনে তৈরি হয়েছে বড় সংকট। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৃষ্টি কমে যাওয়ার কারণে ভূগর্ভস্থ পানি প্রতিস্থাপন হচ্ছে না।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ছিল ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা নেমে যায় ৩৫ ফুটে। ২০০৪ সালে ৫১ ফুট এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে পৌঁছে। বর্তমানে বহু এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটেরও নিচে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুটের বেশি খনন করেও পানি মিলছে না।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশের বেশি এলাকা পানি সংকটে রয়েছে। উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দু’দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় সরকার গত বছর রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করে। এ ছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এবং এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে। সরকারি হিসাবে এসব এলাকার আয়তন প্রায় দুই হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার। সেখানে প্রায় ২১ লাখ পাঁচ হাজার মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, এসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নলকূপ স্থাপনেও আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। বাস্তবে অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা অব্যাহত রয়েছে।
পানি সংকট এখন শুধু কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বহু গ্রামে নিরাপদ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। রাজশাহীর তানোরের উচ্চাডাঙ্গা গ্রামে শত শত গভীর নলকূপ অচল হয়ে পড়েছে। ডাসকো ফাউন্ডেশন এক হাজার ৪০০ ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করেও ওই গ্রামের অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত পানির স্তর পায়নি।
বাড়ছে সেচ ব্যয়, কমছে উৎপাদন
পানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। রাজশাহীর কৃষানি শব্দরানী বলেন, আগে এক ঘণ্টা সেচের জন্য ৯০ টাকা লাগত, এখন লাগে ১২০ টাকা। সারের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, তবে ফলন কমেছে।
সরকারি নির্দেশনায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে ব্যক্তিমালিকানায় হাজার হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, তিন জেলায় ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও প্রায় চার হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এসব নলকূপের পানি তোলার সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান।
বাংলাদেশে ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে শুধু নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ালেই হবে না। এর জন্য পানিসাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, জলবায়ু সহায়ক কৃষি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের বড় কারণ ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এলাকায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি নলকূপ থাকার কথা। এর মধ্যে বিএমডিএ পরিচালনা করছে আট হাজার ৪০০টি। তবে ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত নলকূপের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজারে পৌঁছেছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করতে আমরা একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে দিয়েছিলাম। বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
