ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

চুক্তি সই প্রক্রিয়ার মাঝে আরেক অশান্তির ইঙ্গিত

চুক্তি সই প্রক্রিয়ার মাঝে আরেক অশান্তির ইঙ্গিত
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৯:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি সংকট সমাধানের আশা করা হচ্ছে। তবে গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা এক মন্তব্যে নতুন আরেক সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যেটি সিরিয়া, লেবানন ও ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহকেন্দ্রিক।

ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সামলাতে সিরিয়া ব্যবস্থা নিতে পারে। এ নিয়ে ইসরায়েলকেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, লেবাননের পাশাপাশি সিরিয়া ও গাজাতেও যতদিন প্রয়োজন ততদিন সেনা মোতায়েন থাকবে।

আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষর হতে পারে। তবে লেবানন পরিস্থিতি এখনও এই স্মারক বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে আছে। মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, বৈরুতসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার শর্ত সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেহরানের দৃষ্টিতে সমঝোতায় দুটি পক্ষ আছে– একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহ।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবাননের দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হবে না বলে উল্লেখ করেন আরাঘচি। তাঁর ভাষ্য, এখন থেকে লেবাননে জায়নবাদীদের যে কোনো সামরিক আগ্রাসনকে সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে।  

অন্যদিকে লেবাননে হামলা বন্ধ না করার বিষয়ে নেতানিয়াহু যে যুক্তি দিয়েছেন তা হলো, এই মুহূর্তে সেনা সরিয়ে নিলে উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ ক্ষুণ্ন হবে। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল মূলত লেবাননের সীমান্তবর্তী এলাকা। এই অঞ্চলের ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’-সংশ্লিষ্ট বিষয়টি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি জনমত জরিপের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, এই স্বার্থ রক্ষা করতে না পারলে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভরাডুবি হতে পারে।

নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত
মঙ্গলবার জি৭ সম্মেলনে আবারও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সমালোচনা করেন ট্রাম্প। 

তিনি বলেন, দেশটিতে ইসরায়েলের অভিযানের কারণে অনেক প্রাণহানি হচ্ছে। তাই তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দিয়েছেন, তেল আবিব যদি প্রাণহানি ছাড়াই হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারে তাহলে সিরিয়া ব্যবস্থা নেবে।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, শারা অসাধারণ কাজ করছেন। হিজবুল্লাহকে সামলাতে ইসরায়েল যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে শারা কাজটি করবেন। সিরিয়া কাজটি করবে। ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন আল-শারা। তিনি এক সময় আল কায়দা ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসী সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন তাহরির আল-শামকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দেয়। 

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী গৃহযুদ্ধ শুরু করেছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তাহরির আল-শাম। ওই যুদ্ধে ২০১৩ সালে আসাদ বাহিনীর পক্ষে অংশ নিয়েছিল ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ‘আইআরএল’। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় এবার তাহরির আল-শামের সাবেক নেতা আল-শারাকে কাজে লাগাতে চাইছেন, যা অঞ্চলটিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা জাগাচ্ছে।

সিরিয়ার ক্ষমতায় বসার পর গত বছর ওয়াশিংটনে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন আল-শারা। তখন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় এবং সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দামেস্কের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের প্রত্যাশা– সিরিয়া আব্রাহাম চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শারা নিজেও বলেছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে তিনি একটি নিরাপত্তা চুক্তি চান। একই বছরের ডিসেম্বর থেকে ইসরায়েল জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনে (সিরিয়া সীমান্তবর্তী) সেনা মোতায়েন করে। পাশাপাশি সিরিয়ায় বেশ কয়েক দফায় হামলা করে। কিন্তু দামেস্ক কোনো পাল্টা জবাব দেয়নি।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, লেবাননে কোনো ধরনের সংঘাত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসন মঙ্গলবার এএফপিকে বলেন, সংঘাতের এই ক্ষেত্র আসন্ন আলোচনায় শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

মূল সমস্যা ঝুলে আছে
রয়টার্স বলছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যে দুটি বিষয়কে হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেগুলো হলো– ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা। কিন্তু এগুলো আসন্ন আলোচনার বিষয়বস্তু বলে মনে হচ্ছে না।

অন্তত ৬০ দিনের আলোচনা পর্বটি শুরু হওয়ার কথা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর। মূলত এই আলোচনার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার বলেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়টিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে মনে করে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ২০ বছরের বদলে ১৫ বছরের ব্যবস্থাও মেনে নিতে পারেন।

মূল সমস্যার সমাধান নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা না হলেও ইরানের অতিরক্ষণশীল দৈনিক ভাতান-ই এমরুজ সম্ভাব্য সমঝোতাকে ট্রাম্পের ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে মঙ্গলবার আব্বাস আরাঘচি তাঁর বক্তব্যে বেশ সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার ইতিহাসও আছে। তেহরান সেগুলো ভুলে যায়নি।

ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোনাথন রাইনহোল্ড রয়টার্সকে বলেছেন, এই সমঝোতা চুক্তিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন না। তিনি বরং চূড়ান্ত চুক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রত্যাশা এবং সমঝোতায় স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারেন। এই উদ্যোগকে তখন ইসরায়েলিদের স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে।

ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেনের কথাতেও এমন ইঙ্গিত আছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘কান’-এ তিনি বলেন, ইরান যদি আবার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে ইসরায়েল একাই (যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া) পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।

 

আরও পড়ুন

×