পর্তুগালের সামনে ‘সিঁদুরে মেঘ’ কঙ্গো
কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে আজ শেষের শুরু করছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। হিউস্টনে সে ম্যাচের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পর্তুগিজ তারকা -এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৯:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
খবরটি তখন সবার মুখে মুখে– কেপ ভার্দের কাছে আটকে গেছে স্পেন। মাথা চুলকে আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের হিসাব, তাহলে কি রাউন্ড অব থার্টি টুতেই মেসি-ইয়ামাল মুখোমুখি হবে? সবাই তো ধরেই রেখেছে, সেমি কিংবা ফাইনালের আগে অন্তত আর্জেন্টিনাকে এই পরীক্ষায় পড়তে হবে না। সংবাদ সম্মেলনে আসা মেসিদের কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও হতভম্ভ মনে হলো। ‘এই বিশ্বকাপে কোনো সহজ প্রতিপক্ষ নেই। যারা এই বিশ্বমঞ্চে এসেছে, তারা প্রত্যেকেই এখানে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেই এসেছে।’ তিনি দার্শনিকের মতোই সত্যটা স্বীকার করেন। লোকের মুখে বলা ‘ছোট দল’গুলোই একের পর এক আতঙ্ক তৈরি করে যাচ্ছে ‘বড় দল’গুলোর সঙ্গে। পরাশক্তিদের এই কেঁপে ওঠার আবহেই আজ গ্রুপ ‘কে’তে হিউস্টনের
এনআরজি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল আর ৫২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফেরা আফ্রিকার দল কঙ্গো; যেখানে কিংবদন্তি রোনালদো তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন।
বিশ্বকাপে অতীতে দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মরক্কোর কাছে হেরে ‘ঘরপোড়া গরু’ পর্তুগাল। তাই আজকের ম্যাচে কঙ্গো তাদের জন্য আদতে ‘সিঁদুরে মেঘ’। কারণ এই কঙ্গোর কাছে আজকের ম্যাচে হারানোর কিছু নেই; বরং কেপ ভার্দের মতো তাদের পাওয়ার আছে অনেক কিছুই। ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসারের অধীনে দলটি গড়ে উঠেছে ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ নিয়ে। দলটির সবাই ইউরোপিয়ান লিগে খেলে। এমবেম্বা আর তুয়ানজেবের মতো ডিফেন্ডাররা পর্তুগালের হাইপ্রেস অ্যাটাক রুখে দিতে প্রস্তুত। র্যাঙ্কিংয়ের ৪৫ নম্বর দল কঙ্গো ভালো করেই জানে, বল পজেশনের লড়াইয়ে তারা পর্তুগালের সঙ্গে পারবে না, তাই তাদের কৌশল হতে পারে ‘কমপ্যাক্ট মিড ব্লক’। সোজা কথা, নিজেদের ডি বক্সের সামনে আস্ত একটা বাস পার্ক করে দাও! এর আগে দুই দল কখনোই মুখোমুখি হয়নি। তবে রোনালদোর এই পর্তুগালকে কে না জানে, ইউরোপিয়ান জায়ান্ট তারা। র্যাঙ্কিংয়ের ৫ নম্বর দলকে ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিট গোলশূন্যতে আটকে রাখতে পারলে একটা মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পেতে পারে কঙ্গো। এমনিতে
একটা উপেক্ষার যন্ত্রণা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। দেশে ‘ইবোলা’ ভাইরাস ছড়ানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী কঙ্গো দলের সবাইকে অন্য দেশে গিয়ে আইসোলেশনে থাকতে হয়েছে। খুব ইচ্ছা ছিল কঙ্গোর মানুষের যে তাদের প্রিয় দলকে দেশ থেকে সংবর্ধনা দেবে। কিন্তু উপায় না দেখে তাদের ইউরোপের বেলজিয়াম আর স্পেনে গিয়ে আইসোলেশন বাবলের মধ্যে থাকতে হয়। রোনালদো যখন যুক্তরাষ্ট্রে নেমে ফ্লোরিডার সৈকতে ছুটির মেজাজে ছিলেন, কঙ্গোর ছেলেরা তখন হোটেলে বন্দি হিউস্টনে। অপমান আর জেদে ফুঁসছে তারা। ‘আমাদের অনেক বাধা পেরিয়ে এখানে আসতে হয়েছে। আমাদের খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তি অন্য পর্যায়ে। এই প্রতিকূলতাই মাঠে আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।’ ম্যাচের আগে রীতিমতো ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কঙ্গোর কোচ দেসারে।
শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও তারা যথেষ্ট শক্তিশালী। তার ওপর আবার টেক্সাসের প্রচণ্ড গরম তাদের জন্য সহনীয়। আফ্রিকার কিনশাসা বা লুবুম্বাশির চড়া রোদ আর আর্দ্রতায় ফুটবল খেলে এমবেম্বারা বড় হয়েছেন। তাই হিউস্টনে কড়াই গরম তাদের জন্য মোটেই চ্যালেঞ্জে ফেলবে না। যার প্রমাণ এ আসরেই আফ্রিকান দলগুলো দেখিয়ে দিয়েছে। ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে মরক্কো, বেলজিয়ামের সঙ্গে মিসরের ১-১ ম্যাচ, স্পেনের সঙ্গে কেপ ভার্দের ড্র সেটাই প্রমাণ করে। অবাক করা রেজাল্ট এসেছে অন্য ম্যাচগুলোতেও, যেখানে সৌদি আরব ১-১ গোলে রুখে দিয়েছে উরুগুয়েকে, কাতার সুইজারল্যান্ডকে আর নিউজিল্যান্ড ইরানকে।
অবশ্য যারা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এসেছে, তাদের এসব দেখে ভয় পেলে কি চলে? এই মুহূর্তে দারুণ ফর্মে আছে পর্তুগিজরা। গত ছয় ম্যাচে গুনে গুনে ২০টি গোল দিয়েছে তারা প্রতিপক্ষের জালে। র্যাঙ্কিংয়ের পাঁচ নম্বর দলটির প্রত্যেকে এতটাই ভালো ফর্মে আছেন যে স্কোয়াডের ২৬ জনের থেকে শুরুর একাদশ বেছে নেওয়ার পরীক্ষায় নামতে হচ্ছে তাদের কোচ মার্টিনেজকে। ‘আমরা দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ২৬ জন খেলোয়াড়কেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেছি এবং তারা সবাই বিশ্বকাপের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমি এখনও শুরুর একাদশ চূড়ান্ত করিনি। আমাদের স্কোয়াডে একই রোলের জন্য একাধিক উচ্চমানের ফুটবলার রয়েছে।’ তিনি মুখে না বললেও একাদশের কিছু নাম প্রায় সবারই মুখস্থ–ভিতিনহা, নেভেস, ব্রুনো, রোনালদো ও লিও।
কাগজে-কলমে পর্তুগাল দলটি হয়তো ৩-৪-৩ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামবে। কিন্তু বল যখনই তাদের পায়ে থাকবে, মার্টিনেজের দল রূপান্তর হয়ে যাবে এক ভয়ংকর ‘৩-২-৫’ অলআউট অ্যাটাকিং লাইনে। জোয়াও কানসেলো ও নুনো মেন্দেসের মতো দুই উইং-ব্যাক ডিফেন্স ছেড়ে একেবারে ওপরে উঠে গিয়ে দুই উইঙ্গারের ভূমিকা নেবেন। উদ্দেশ্য একটাই–কঙ্গোর রক্ষণাত্মক দেয়াল চ্যান্সেল এমবেম্বাদের চওড়ায় টেনেহিঁচড়ে ভেঙে দেওয়া, যাতে বক্সের ভেতর ৪১ বছরের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ফাঁকা জায়গা পেয়ে বিষাক্ত ছোবল মারতে পারেন। তেমন হলে কঙ্গোর কোনো রূপকথা নয়, পর্তুগালের বিধ্বংসী রূপ দেখতে পারে হিউস্টন।
- বিষয় :
- পর্তুগাল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
