ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সমন্বয়হীনতায় অকেজো ৩০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় নীতি সংস্কারের তাগিদ

সমন্বয়হীনতায় অকেজো ৩০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় নীতি সংস্কারের তাগিদ
×

ছবি-সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৮:১৫ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৮:৪১

মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ করায় দেশে স্থাপিত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের অর্ধেকই এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নীতিগত সমন্বয়হীনতার কারণে এই খাতের বিপুল বিনিয়োগের বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, একই সঙ্গে নষ্ট ব্যাটারি ও প্যানেল নতুন পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিপিডি।

সিপিডির ‘এসএইচএস সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০০৩ সালে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাইকার অর্থায়নে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোর লক্ষ্যে সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি শুরু করে। প্রায় ৩০টি সহযোগী এনজিওর মাধ্যমে পরিচালিত এ কর্মসূচি একসময় বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচিতে পরিণত হয় এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনে।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে এক বছরে রেকর্ড ৮ লাখ ৫৩ হাজার সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই জাতীয় গ্রিডের দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু হলে সোলারের চাহিদা কমতে থাকে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশজুড়ে গ্রিড সম্প্রসারণের ফলে সোলার হোম সিস্টেমের প্রাসঙ্গিকতা দ্রুত কমে যায়। এর চূড়ান্ত প্রভাব দেখা যায় ২০১৮ সালে, যখন বার্ষিক নতুন সোলার স্থাপন ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩ হাজার ৪৫৫তে নেমে আসে।

সিপিডির গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ বলেন, সোলার হোম সিস্টেমগুলোর সক্ষমতা ছিল সীমিত। কয়েকটি বাতি জ্বালানো ও মোবাইল চার্জ দেওয়ার বাইরে এগুলোর ব্যবহার ছিল কম। ফলে গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই গ্রিড বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকেছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সোলার বিক্রি ও ঋণ বিতরণ এবং অন্যদিকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই গ্রিড সম্প্রসারণের মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় বিপুল বিনিয়োগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমের প্রায় ৪৭ শতাংশ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ লাখ বা তারও বেশি সিস্টেম এখন ব্যবহারহীন। এসব ব্যবস্থাকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত বা আধুনিকায়নের জন্য কোনো রূপান্তরমুখী নির্দেশিকা তৈরি হয়নি। ফলে নষ্ট ব্যাটারি ও প্যানেল গ্রামীণ এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে অফ-গ্রিড সোলারের চাহিদা কমলেও দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিস্তার নীরবে বাড়ছে। আতিকুজ্জামান সাজিদ জানান, বর্তমানে দেশে নেট-মিটারিংভিত্তিক ৪ হাজার ৫৫১টি রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৫৩১টি নতুন স্থাপনা যুক্ত হয়েছে। দেশের মোট রুফটপ সৌরবিদ্যুতের ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত।

তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সাধারণত মোট উৎপাদনের ৪ থেকে ৫ শতাংশ নিয়ে আলোচনা হলেও গত এক থেকে দুই বছরে নেট মিটারিং ব্যবস্থায় প্রায় ৩০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শিল্প ও আবাসিক পর্যায়ে এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং ভবিষ্যতে পরিবহন খাতেও এর প্রভাব দেখা যাবে।

সংলাপে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। তিনি বলেন, পাকিস্তান দেখিয়েছে কীভাবে একটি জ্বালানি সংকটকে সুযোগে পরিণত করা যায়।

মোয়াজ্জেম জানান, বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ, ৯ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং ৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন, সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। এগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সংলাপে পাকিস্তানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা ‘রিনিউয়েবলস ফার্স্ট’-এর প্রধান কর্মসূচি ও উদ্যোগ বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বাসিত গৌরী ‘সোলার রাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের নতুন এক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তবে উচ্চ কর, অর্থায়নের সংকট এবং নীতিগত জটিলতা এই রূপান্তরের বড় বাধা।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে সৌর প্যানেল আমদানি ১৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই বিতরণভিত্তিক পর্যায়ে। ২০২৩ সালে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ পরিবার গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত।

বাসিত গৌরী বলেন, বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, গ্রিড ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং চীনে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে সৌর প্যানেলের দাম এক বছরে ৪৩ শতাংশ কমে যাওয়া পাকিস্তানের সৌর বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। তিনি জানান, দেশটিতে সৌর খাতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের প্রায় দ্বিগুণ। এর ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশই এসেছে সাধারণ মানুষের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে।

তার ভাষ্য, সৌরবিদ্যুতের কারণে ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো গেছে, প্রায় পাঁচ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি তেল ও গ্যাস আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দেশের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এ খাতকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফরে রয়েছেন। এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও সৌরবিদ্যুৎ খাতে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চিফ হুইপ জানান, জাতীয় সংসদ ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে সব সরকারি ভবনের ছাদ এবং শিল্পকারখানাগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের উপকারে এবং সেচ খরচ কমাতে সারা দেশের সেচ পাম্প ও টিউবওয়েলগুলোকে ধাপে ধাপে সৌরশক্তিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নিয়ে সংসদে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগে সহযোগিতা দিতে তিনি প্রস্তুত।

সংলাপে রিনিউয়েবল এনার্জি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার জানান, আগামী পাঁচ বছরে ৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম কম হওয়ায় গ্রাহকেরা সৌরবিদ্যুতের দিকে ততটা ঝুঁকছেন না। পাশাপাশি পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে সূর্যের আলোর প্রাপ্যতাও প্রায় ৫০ শতাংশ কম। তাই অন্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখে সরাসরি অনুসরণ না করে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিবছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির ওপর থেকে কর-শুল্ক তুলে দিলে মানুষ নিজ উদ্যোগেই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহী হবে। তার মতে, জাতীয় গ্রিডের ক্ষতি না করেই ২০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব।

স্রেডার সদস্য আশরাফুল আলম জানান, বর্তমানে ব্যাটারিতে ৬২ থেকে ৬৭ শতাংশ এবং সাধারণ আমদানিকারকদের জন্য সৌর প্যানেলে প্রায় ২৯ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। এ বৈষম্য দূর করতে সরকার উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে এবং এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামী মাসেই নতুন শুল্ক কাঠামো নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

সংলাপ শেষে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর শুল্ক প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা, আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ ও ডিজিটাল করা, সৌর প্রকল্পে সহজ অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি, সৌর সম্পদকে ব্যাংক ঋণের জামানত হিসেবে গ্রহণের ব্যবস্থা করা এবং পুরোনো সোলার হোম সিস্টেমগুলোকে হাইব্রিড বা গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থায় রূপান্তরের দাবি জানান। তাদের মতে, পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—সঠিক নীতি, কর-সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাবে না, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

আরও পড়ুন

×