মধ্য জুলাইয়ে আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করবে ইসি
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৮:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আচরণ বিধিমালার খসড়া মধ্য জুলাইয়ে চূড়ান্ত করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে ইসির ওয়েবসাইটে দেওয়া খসড়ার ওপর অংশীজনের মতামত পর্যালোচনা করে কিছু সংযোজন-বিয়োজন আনা হবে। এর পর কমিশন সভায় খসড়া চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করার কথা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কঠোর বিধিমালা যুক্ত করা হচ্ছে।
এর আগে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জন্য আলাদা আচরণবিধির খসড়া প্রণয়ন করে ইসি। এর পর সেগুলো অংশীজনের মতামত দেওয়ার জন্য ইসির ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। ইসিতে নিবন্ধিত ৫৬ রাজনৈতিক দলকে ইমেইলে এগুলো পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ৩০ জুন। তবে এবার খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করবে না ইসি।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনী আচরণবিধি সর্বশেষ সংশোধন করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। এই বিধিমালার নিয়মে সব স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখনকার নির্বাচন হয়েছে দলীয় ভিত্তিতে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সরকার এসব নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী জাতীয় সংসদে আইনও পাস হয়েছে। ফলে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালায় ইসিকে বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
গত রোববার ইসির স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতিবিষয়ক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই নির্বাচনের আইনকানুন ও আচরণবিধির খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সমকালকে বলেন, অংশীজনের মতামত পাওয়ার পর সাধারণত ১৫ দিনের মধ্যে আচরণ বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে আমরা সম্পন্ন করতে পারব। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাংবাদিকসহ যে কেউ মতামত দিতে পারবেন। সবার গ্রহণযোগ্য মতামত নিয়েই খসড়া আচরণ বিধিমালায় সংযোজন-বিয়োজন আনা হবে।
এই নির্বাচন কমিশনার আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে অক্টোবরকে লক্ষ্য ধরেই কাজ এগিয়ে নিচ্ছে ইসি। ৪৫ দিন আগে তপশিল ঘোষণা করা হবে। সে হিসাবে আগস্টের মাঝামাঝি তপশিল ঘোষণা হতে পারে।
যুক্ত হচ্ছে কঠোর বিধি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রণীত খসড়া আচরণবিধিতে কঠোর নিয়মকানুন যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে ইসি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং সংসদে পাস হওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনের আলোকে এসব বিধি ও নিয়ম যুক্ত করা হচ্ছে। যেখানে আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা, প্রচারকাল সংক্ষিপ্ত করা, সামাজিক মাধ্যমের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ, পোস্টার নিষিদ্ধ এবং মাইক ও শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী যন্ত্রের (সাউন্ড সিস্টেম) ব্যবহার সীমিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব খসড়া আচরণ বিধিমালার প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা বিধিমালা প্রণীত হলেও সব বিধি ও নিয়মকানুনে মোটামুটি মিল রয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা পরিষদের বিধিমালায় ৩৩টি করে সাধারণ বিধান রয়েছে। শুধু উপজেলা পরিষদের খসড়ায় বাড়তি একটি ধারা যোগ করা হয়েছে। যেখানে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন থেকে ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নির্বাচনী প্রচার ও ভোট সম্পর্কিত কার্যকলাপের জন্য উপজেলা কার্যালয় ও সরকারি যানবাহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রার্থী বা তাদের এজেন্টরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে লিখিত আদেশের মাধ্যমে তাদের প্রার্থিতা তাৎক্ষণিক বাতিল করা হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি আগে ছিল ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা। নতুন খসড়ায় কারাদণ্ড অপরিবর্তিত রেখে জরিমানা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যান্য স্তরের জন্য শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রার্থীরা আরপিওতে বেঁধে দেওয়া ব্যয়সীমা অতিক্রম করলেও শাস্তির বিধান থাকছে সংসদ নির্বাচনের মতোই।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় কমিয়ে এনে দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার বদলে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত করা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মতোই পোস্টার নিষিদ্ধ থাকছে। জাতীয় নির্বাচনে অনুমোদিত পোস্টাল ব্যালট স্থানীয় নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন এবং ব্যানার শুধু পচনশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি হলেই অনুমতি দেওয়া হবে।
পচনশীল উপকরণ দিয়ে সজ্জিত ডিজিটাল ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ যানবাহন দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবে। তবে এগুলো যেন যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করে– এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মাইক বা সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার প্রতি ওয়ার্ডে একটি মাইক্রোফোনে সীমাবদ্ধ থাকবে। যার ব্যবহার দুপুর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। অনলাইনে প্রচার চালানোর আগে প্রার্থীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, অ্যাকাউন্ট আইডি এবং ইমেইল নিবন্ধন করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুল তথ্য, বিকৃত ছবি বা মনগড়া বিষয়বস্তু নিষিদ্ধ। প্রার্থী বা তাঁর সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবেন না।
এদিকে, প্রচারণায় সীমিত সংখ্যায় বিলবোর্ড (১৬ ফুট বাই ৯ ফুট) ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য একজন প্রার্থী প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারবেন। আর উপজেলা নির্বাচনের জন্য পৌর এলাকায় প্রতি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে একটি (যা প্রতি নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি পর্যন্ত হতে পারে) বিলবোর্ড স্থাপন করতে পারবেন। জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থীরা প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি বিলবোর্ড বসাতে পারবেন।
- বিষয় :
- ইসি
