ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন

তদন্ত ও অনুদান পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি

তদন্ত ও অনুদান পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ১৩:২২

দেশের নাট্যচর্চাকে গতিশীল রাখতে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অনুদান ঘিরেই এবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তীব্র ক্ষোভ আর নেতৃত্ব সংকটের রাজনীতি। দেশের নাট্যাঙ্গনের শীর্ষ সংগঠন ‘বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন’ এর বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং সরকারি অনুদান বণ্টনে চরম অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ।

গত ২৫ জুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে এই নাট্যজন স্পষ্ট জানিয়েছেন, সংগঠনের সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটি পক্ষ ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। আর এ কারণে সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়া ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার রাষ্ট্রীয় অনুদান অপব্যবহারের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভরার জন্য নয়। এটি দেশের নাট্য আন্দোলনের যৌথ সম্পদ। এমন মন্তব্য করে মামুনুর রশীদ অনতিবিলম্বে এই অনুদান স্থগিত, সুষ্ঠু তদন্ত এবং বরাদ্দ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান।

এ বিষয়ে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম জানান, অনুদান প্রক্রিয়ার এই অসঙ্গতিগুলো আমরা খতিয়ে দেখবো এবং পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।

ভাঙ্গনের শুরু

ফেডারেশনের ভেতরের এই ক্ষত একদিনে তৈরি হয়নি। এর সূত্রপাত ২০২২ সালের জানুয়ারিতে, যখন ‘আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের’ গুরুতর অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ এবং অর্থ সম্পাদক রফিকুল্লাহ সেলিমকে নাটকীয়ভাবে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

যদিও কামাল বায়েজীদ তৎকালীন সভাপতি লিয়াকত আলী লাকীর দিকে আঙুল তুলে দাবি করেছিলেন, সভাপতির দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাতেই তাঁকে অগণতান্ত্রিক উপায়ে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। কর্তাব্যক্তিদের এই কাদা-ছোড়াছুড়ির জেরে নাট্যকর্মীদের ভাবমূর্তি যখন ধুলোয় মিশছিল, তখন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রামেন্দু মজুমদার। থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে এক খোলা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘নাট্যকর্মীরা সুন্দর পরিবেশে নাটক করতে চান, নোংরা রাজনীতি চান না।’ তিনি তখন সংগঠনের ব্যাংক হিসাব ও কার্যক্রম ফ্রিজ করার পরামর্শ দিলেও তৎকালীন ক্ষমতাধারী পক্ষ তা কানে তোলেনি।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট আরও বদলে যায়। সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী আত্মগোপনে চলে গেলে থমকে দাঁড়ায় ফেডারেশনের চাকা।

অন্তর্বর্তীকালীন উদ্যোগ ও সমান্তরাল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

এই অচলাবস্থা ভাঙতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লাকি ইনামের আহ্বানে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৪টি নাট্যদলের সম্মতিতে মামুনুর রশীদকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি ‘আহ্বায়ক কমিটি’ গঠন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করে গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেওয়া।

কিন্তু নাট্যাঙ্গনে শৃঙ্খলা ফেরার এই চেষ্টাতেও জল ঢেলে দেওয়া হয়। মামুনুর রশীদের অভিযোগ, তাঁদের সেই বৈধ কমিটিকে অকার্যকর করতে কামাল বায়েজীদ ও তাঁর সহযোগীরা সমান্তরালভাবে আরেকটি গ্রুপ তৈরি করে কার্যক্রম চালাতে শুরু করেন। এই নোংরা কোন্দলের মুখে পড়ে মামুনুর রশীদসহ কমিটির অন্য সদস্যরা (মলয় ভৌমিক, আহমেদ ইকবাল হায়দার, নাদের চৌধুরী ও নাজনীন হাসান চুমকী) সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। ফলে বর্তমানে ফেডারেশনের আসল অভিভাবক কে-তা নিয়ে থিয়েটার পাড়ায় চলছে চরম হাহাকার।

'পকেট সংগঠন' পায় অনুদান, বঞ্চিত সক্রিয়রা

এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মাঝেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার চেক বরাদ্দ দেওয়া হলে বিতর্ক নতুন রূপ নেয়। মামুনুর রশীদের চিঠিতে বিস্ফোরক এক অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে থিয়েটারে নিষ্ক্রিয়, কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকা কিছু ‘পকেট সংগঠন’কে মোটা অঙ্কের অনুদান পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, দিন-রাত মঞ্চে ঘাম ঝরানো নিয়মিত ও সক্রিয় নাট্যদলগুলোকে দেওয়া হয়েছে নামমাত্র অর্থ।

কীসের ভিত্তিতে, কোন নীতিমালায় এই বৈষম্যমূলক বণ্টন হলো-তা নিয়ে এখন নাট্যকর্মীদের মনে তীব্র ক্ষোভ। তবে এই সমস্ত অভিযোগের মুখে এখনই মুখ খুলতে রাজি হননি কামাল বায়েজীদ। তিনি জানান, চিঠির বয়ান পুরোপুরি না জেনে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

×