ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

সাক্ষাৎকার: ড. তানাকা আকিহিকো

মেট্রোরেলের নতুন দুই লাইনের কাজ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছি

মেট্রোরেলের নতুন দুই লাইনের কাজ এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছি
×

ড. তানাকা আকিহিকো

জাকির হোসেন 

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে জাইকার অংশীদারিত্ব এবং জাপান ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে সমকালের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাকির হোসেন 

সমকাল: বাংলাদেশে জাইকা ১৯৭৩ সাল থেকে কাজ করছে। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ-জাপান অংশীদারিত্বের বিবর্তনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ভবিষ্যতে এই অংশীদারিত্বকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ রাখতে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

তানাকা আকিহিকো: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। কয়েক দশকে বাংলাদেশ নিজেও ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশ ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আমার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। উনিশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বের অর্থনৈতিক গতিশীলতার কেন্দ্র ছিল উত্তর ইউরোপ, যা  পরে  উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। ফলে বিংশ শতাব্দী মূলত আটলান্টিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাধান্যের যুগ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যেতে শুরু করে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে তাই অনেকেই ‘এশিয়া-প্যাসিফিকের যুগ’-এর কথা বলতেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই পরিবর্তন আরও এগিয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। তাই এখন আমরা প্রায়ই ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের যুগ’-এর কথা বলি। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই কেন্দ্র পরিবর্তনের পটভূমিতেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে।

বাংলাদেশে জাইকার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বন্ধু এবং উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে কাজ করেছি এবং আমার বিশ্বাস, এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে জাপানের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছে। তবে ঐতিহ্যগত এই দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতি জাপানের সহযোগিতা এখন আরও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে। একইভাবে, বাংলাদেশের কাছেও জাপানের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এর কারণ, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রও ক্রমেই ইন্দো-প্যাসিফিকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাপানের সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেই গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি।

আমার উপলব্ধি, জাপানের সহযোগিতা এখন শুধু ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা নয়; এর সঙ্গে উভয় দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের নতুন মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। আমি যখন ‘কৌশলগত’ শব্দটি ব্যবহার করছি, তখন এর অর্থ সামরিক কৌশল নয়। আমি বৃহত্তর অর্থে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের কথা বলছি, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও জাপান; উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সমকাল: জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। জাইকার সহযোগিতায় নির্মিত মেট্রোরেল লাইন এমআরটি-৬ ঢাকার দৈনন্দিন যাতায়াত অনেক সহজ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ নতুন মেট্রোরেল লাইনের অপেক্ষায়। এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ বাস্তবায়নের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানাবেন? 

তানাকা আকিহিকো: জাইকা বাংলাদেশে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, দেশের শিল্প ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত, নগর অবকাঠামো ও নগরসেবার উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। তৃতীয়ত, সমাজে এখনও বিদ্যমান বিভিন্ন দুর্বলতা ও ঝুঁকি দূর করা। ঢাকা মেট্রোরেল এই নগর উন্নয়ন উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ আমি নিজেই উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে সচিবালয় স্টেশন পর্যন্ত ভ্রমণ করেছি। আমি নিশ্চিত হয়েছি, এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য সত্যিই অত্যন্ত উপকারী একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা। এ কারণে আমরা এখন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ এর নির্মাণকাজ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

সমকাল: এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ এর ব্যয় প্রাক্কলন এবং প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় আগের প্রাক্কলনের চেয়ে বেড়ে গেছে।  এ বিষয়ে কোনো আলোচনা আপনার সফরে হয়েছে?  

তানাকা আকিহিকো: বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়; জাপানের অনেক অংশীদার দেশেই মূল্যস্ফীতি ও নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতে, এমনকি ঋণচুক্তি হওয়ার আগেই যে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়, পরবর্তীকালে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই হিসাব অনেক সময় অতিক্রম করে যায়। তাই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে আমাদের আলোচনা করতে হয়। যৌক্তিকভাবে এর দুটি সম্ভাব্য সমাধান রয়েছে। যদি ব্যয় বা মূল্য কমানো সম্ভব হয়, সেটিই সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রথম বিকল্প হলো প্রকল্পের পরিধি কমিয়ে আনা। অর্থাৎ আগে থেকে সম্মত অর্থায়নের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সীমিত করা। দ্বিতীয় বিকল্প হলো অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা, যাতে মূল্যবৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, তা সমন্বয় করা যায় এবং সেই অনুযায়ী প্রকল্পের মোট অর্থায়ন বাড়ানো যায়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অর্থায়নেরও দুটি সম্ভাব্য উৎস রয়েছে। একটি হলো সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার নিজস্ব বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে। অন্যটি হলো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। এই সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, তা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে হবে। এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ এর ক্ষেত্রে  প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয়  প্রক্রিয়া এবং সর্বোত্তম ঠিকাদার নির্বাচন যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা দরকার। এটাই আমাদের উপলব্ধি।

সমকাল: বাংলাদেশ সরকার জাইকার কাছে ঋণের সুদের হার কমানোর অনুরোধ জানিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? জাইকা কি বিষয়টি বিবেচনা করছে বা এ নিয়ে কোনো পর্যালোচনা করছে?

তানাকা আকিহিকো: ঋণ গ্রহণকারী দেশের জন্য যথাসম্ভব কম সুদে অর্থায়ন নিশ্চিত করা উচিত– এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বাংলাদেশ সরকার জাপানের কাছ থেকে আরও বেশি কনসেশনাল (রেয়াতি) ঋণ প্রত্যাশা করছে, যা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক বলেই আমি মনে করি। তবে এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, এখন যে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হলে চলমান প্রকল্পগুলোর আরও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতের ঋণের ক্ষেত্রে শর্তাবলি নতুনভাবে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশ যদি আরও বেশি রেয়াতি সুবিধা চায়, তাহলে তার জন্য জাইকা ও জাপান সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে।

সমকাল: আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আপনার এই সফরকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

তানাকা আকিহিকো: আমরা ভবিষ্যতে দুই পক্ষের সহযোগিতা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেছি। জাইকা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার যখন জরুরি বাজেট সহায়তার জন্য অনুরোধ জানায়, তখন আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বাজেট সহায়তা ঋণের ব্যবস্থা করি। আমরা গত জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহেই ওই ঋণের অর্থ ছাড় করতে সক্ষম হই। আমার মনে হয়, এটি বাংলাদেশের প্রতি জাপান সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে জাইকার আন্তরিক আগ্রহ ও প্রস্তুতিরই স্পষ্ট প্রমাণ।

সমকাল: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে আপনি দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন? এ অবস্থায় বাংলাদেশ ও জাইকার মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগগুলো কোথায় রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

তানাকা আকিহিকো: বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক দিকনির্দেশনা কী হবে, সেটি একান্তই বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা  উন্নয়ন সহযোগী  মাত্র। তাই বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের নির্বাচিত সরকার যে সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা সেটিকে সম্মান করি। সম্প্রতি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার ইতোমধ্যে তাদের বাজেট প্রস্তাব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা ঘোষণা করেছে। আমাদের দায়িত্ব হলো সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের সেই অগ্রাধিকারগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং যেখানে সম্ভব, সেসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা। আমাদের উপলব্ধি হলো, সম্প্রতি প্রস্তাবিত বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অগ্রাধিকারগুলো বাংলাদেশে জাইকা দীর্ঘদিন ধরে যে কাজ করে আসছে, তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমরা আমাদের কার্যক্রমে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনতে চাই না। বরং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে একমত হয়েছি, সেগুলোর বাস্তবায়ন যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে নিতে চাই।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নগর অবকাঠামো উন্নয়নে মেট্রোরেল ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আমরা যমুনা রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছি। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন আমরা চাই, উপযুক্ত অপারেটর নির্বাচন করে এটি যত দ্রুত সম্ভব চালু করা হোক।

আমি আগেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বের কথা বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উন্নয়নে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে মাতারবাড়ী প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি প্রধান প্রবেশদ্বার বা বহির্মুখী সংযোগস্থল। তাই মাতারবাড়ীকে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আমরা বিভিন্ন সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। এসব উদ্যোগও সরকারের বাজেটের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে আমরা এসব প্রকল্প আরও এগিয়ে নিতে চাই।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তৈরি পোশাকশিল্পে বিশ্বমানের অবস্থানে রয়েছে। তবে এই শিল্পে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে। আমার ধারণা, বাংলাদেশ সরকারও নতুন শিল্প খাত গড়ে তুলতে চায়, যেগুলো অধিক মূল্য সংযোজন করতে সক্ষম হবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে কাজ করছি। এটি আর্থিকভাবে রেয়াতি ঋণ, বেসরকারি খাতের অর্থায়ন এবং কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে জাইকার সমর্থন পাচ্ছে। ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমাদের আশা, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন বহু নতুন শিল্প খাতের বিকাশ ঘটাতে পারবে।

সমকাল: বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত এবং আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে আপনার কী পরামর্শ থাকবে? বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী করে তুলতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

তানাকা আকিহিকো: আমার মনে হয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়া। একই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, যতটা সম্ভব দুর্নীতি কমিয়ে আনা, বিধি-বিধানকে সহজ ও কার্যকর করা, সেগুলোকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ করা এবং ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো দেশের সমাজ অস্থিতিশীল হয়, নিরাপত্তার অভাব থাকে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত থাকে, দুর্নীতি ব্যাপক হয়, আইন-কানুন ও বিধি-বিধান স্পষ্ট না হয় এবং সেগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সেটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হবে না। ধরুন, একজন সরকারি কর্মকর্তা একটি কথা বলছেন, আরেকজন কর্মকর্তা আবার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। অর্থাৎ নিয়ম-কানুন প্রয়োগে যদি ধারাবাহিকতা না থাকে, তাহলে সেটিও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। আমার বিশ্বাস, বর্তমান সরকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরও স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

সমকাল : আপনি বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চান? 
তানাকা আকিহিকো: আমি একটি বার্তা দিতে চাই– জাপান ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব অব্যাহত থাকবে। আমরা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং উন্নয়ন সহযোগী। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় পাশে থেকে একসঙ্গে কাজ করে যেতে চাই।

সমকাল: সমকালের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। 

তানাকা আকিহিকো: সমকালকেও ধন্যবাদ।
 

আরও পড়ুন

×