ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

রাজনৈতিক দল হিসেবে আ.লীগের বিচার শুরু হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাজনৈতিক দল হিসেবে আ.লীগের বিচার শুরু হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
×

সালাহউদ্দিন আহমদ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে, তাদের দাফন হয়েছে দিল্লিতে। তারা আর বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরু হবে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আওয়ামী লীগকে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, আপনারাও করেছেন। তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৪৭ আর্টিকেল অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের সংগঠনের বিচার করা যাবে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি। যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে।’

জুলাই গণহত্যার বিচারের সর্বশেষ অবস্থা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ইতিমধ্যে ছয়টি গণহত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় হয়েছে। বিচারাধীন মামলা আছে ২৭টি, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে ৭২টি। শহীদ আবু সাঈদের মামলায় প্রথম দুজনের ফাঁসি হয়েছে, ভাইস চ্যান্সেলরসহ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে। প্রথম মামলার রায় হয়েছে গণহত্যার।’ 

মন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তৎকালীন আইজিপি মামুন রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে তাঁর সাজা কম হয়েছে, তবে সাজা হয়েছে। আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসি হয়েছে। সেখানে স্বৈরাচারের দোসর সাবেক এমপি আছে, ওসি আছে; ডিআইজিসহ অন্যান্যদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘চানখাঁরপুলে হত্যা মামলায় ফাঁসির আদেশ হয়েছে তৎকালীন স্বৈরাচারের দোসর পুলিশ কমিশনার হাবিব এবং জয়েন্ট কমিশনার সুদীপ্তর। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। রামপুরা টিভি সেন্টারের ওখানে একটা ছেলে লুকিয়েছিল, তাকে গুলি করা হয়েছিল। আমি শুনলাম, সেই ছেলেটি কোন রকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে। চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহ তার জীবন বাড়িয়ে দিক, হায়াত বাড়িয়ে দিক। সেই ঘটনায় শিশুসহ আরও দুয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই মামলায় রায় হয়েছে। ফাঁসির আদেশ হয়েছে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিব, ওসির এবং অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।’ 

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সর্বশেষ হাসানুল হক ইনু নামের একজন স্বৈরাচারের দোসর আছে তাঁর বিচারের রায় বেরিয়েছে। তাঁকে কেবল ১০ বছরের সাজা দেওয়াতে বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট নয়, সে জন্য সেটা আপিল করা হবে মর্মে শুনেছি। তাঁর অন্তত যাতে সর্বোচ্চ সাজা হয়, সে রকম বিচার আরও আছে, সে মামলাগুলোতে আশা করা যায়।’ 

তদন্ত অব্যাহত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যাসহ বিভিন্ন নৃশংস অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তদন্ত শুরু হয়। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, তদন্ত চলমান। তদন্ত শেষ হলেই প্রসিকিউশন বিভাগে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। ইতিমধ্যে তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে।

এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে গতকাল রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সমকালকে জানিয়েছেন, এখনই কিছু বললেন না। তদন্তের বিষয়টি জেনে পরে তিনি জানাবেন। 

আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম)সহ আরও কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগে আওয়ামী লীগকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধের জন্য পৃথকভাবে লিখিত আবেদন করে, যা তদন্ত সংস্থায় তদন্তাধীন। 

২০২৪ সালের ২ অক্টোবর জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ (বর্তমানে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী) জুলাই গণহত্যার সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক দলগুলোর নামে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এতে কোটা সংস্কার ও সরকার পতনের আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো গণহত্যা চালাতে সরাসরি হুকুম দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। 

ওই অভিযোগে আরও বলা হয়, সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দল– সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ (ইনু), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ ও জাতীয় পার্টি-জেপির বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তদন্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য আইনগত প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সেদিন অভিযোগ গ্রহণ করে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শরিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। 

এরপর গত বছরের ৭ অক্টোবর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার চেয়ে অন্য একটি দলের করা অভিযোগের তদন্ত করতে এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং তিনি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘এনডিএম নামে একটি দল অভিযোগ দিয়েছে। আমরা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছি। সুতরাং বলা যেতে পারে, এ মুহূর্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে।’ 

এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আহত ও শহীদ পরিবারের বেশ কিছু সদস্য আওয়ামী লীগ এবং এর দোসরদের বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে বেশ কয়েক দফা মানববন্ধন করেন।

এদিকে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও। গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কেননা তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলগতভাবে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

এরপর ওই বছরের ৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ যে ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, আমরা মনে করি দল হিসেবে তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। দেড় সহস্রাধিক মৃত্যু ও প্রায় ৩০ হাজার মানুষের আহত হওয়ার পর কোনোভাবেই দায়ী দলকে আবার পুনর্বাসন করতে দেবে না জনগণ।’ 

আইসিটি আইনে যা বলা আছে
২০২৫ সালের ১০ মে রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে ১৯৯৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। 

রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (দ্বিতীয় সংশোধনী) সংশোধিত গেজেটে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠন, অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দল অথবা সেই দলের অধীন, সংশ্লিষ্ট বা সহযোগী কোনো সত্তা অথবা এমন কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে বোঝায়, যা ট্রাইব্যুনালের অভিমত অনুযায়ী, ওই দল বা সত্তার কার্যকলাপ প্রচার, সমর্থন, অনুমোদন, সহায়তা বা সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জড়িত থাকে।

সংগঠনের জন্য শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়, এ আইনে বা তৎকালীন প্রযোজ্য অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, যদি ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রতীয়মান হয়, কোনো সংগঠন এই আইনের ৩ ধারার উপধারা (২) অনুযায়ী উল্লিখিত অপরাধগুলো করেছে, নির্দেশ দিয়েছে, চেষ্টা করেছে, সহায়তা করেছে, প্ররোচিত করেছে, উস্কানি দিয়েছে, ষড়যন্ত্র করেছে, সহজতর করেছে বা সহযোগিতা করেছে, তাহলে ট্রাইব্যুনাল সেই সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ করার, সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার, তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখবে। 

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

সম্পাদনা: আবুল হোসেন

আরও পড়ুন

×