ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

ছাত্রলীগের হামলায় জ্বলল ক্ষোভের আগুন

ছাত্রলীগের হামলায় জ্বলল ক্ষোভের আগুন
×

 সমকাল প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

আগের রাতে দেওয়া স্লোগানের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে। এই বক্তব্যের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের বর্বর হামলা শুরু হয়। এ হামলায় সারাদেশে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। আন্দোলন পরিণত হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। 
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং বহিরাগত নেতাকর্মী নিয়ে ছাত্রলীগের হামলায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও তাদের ওপর হামলা করা হয়। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হাসান মোল্লাসহ তিনজনকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি করতে দেখা যায়। সংগঠনটির বহু নেতাকর্মীকে সেদিন দেশি অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। তারা নারী শিক্ষার্থীদেরও পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। 

১৫ জুলাই যা ঘটেছিল 
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে রাতে বহুল আলোচিত ‘আমি কে তুমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগান দেওয়ার পরদিন ১৫ জুলাই দুপুর ১২টায় কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে মিছিল ও সমাবেশ করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। দুপুর আড়াইটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি দল মিছিল নিয়ে প্রতিদিনের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে যায়। বিকেল ৩টার দিকে খবর আসে, বিজয় একাত্তর হলে মিছিলে শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। 

সেই দিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খবর পেয়ে রাজু ভাস্কর্য থেকে মিছিল নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে বিজয় একাত্তর হলের দিকে যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে নারী শিক্ষার্থীরাও ছিলেন। হলের কাছাকাছি পৌঁছালে আগে থেকে হেলমেট, লাঠিসোটা ও হকিস্টিক নিয়ে হলগেটে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে এগিয়ে এসে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা হলগেটে ভাঙচুর চালান। 

এক পর্যায়ে কবি জসীম উদ্‌দীন হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে এগিয়ে এসে শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালান। এদের সঙ্গে বের হন বিজয় একাত্তর হলের নেতাকর্মীরাও। সবার হাতে ছিল লাঠিসোটা, স্টাম্প, স্টিলের পাইপ ও রড। অনেকে হেলমেট পরিহিত ছিলেন। 

চতুর্মুখী হামলায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পিছু হটতে থাকেন। এ সময় তিন শিক্ষার্থীকে মাটিতে ফেলে মারতে থাকেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেদিন আহত ঢাবির বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক তানভীর আল হাদী মায়েদ বলেন, হলের গেটে ছাত্রলীগ তালা ঝুলিয়ে দেয় যাতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ভেতরে ঢুকতে না পারেন। সেখানে গেলে সাবাত নামে এক ছাত্রলীগকর্মী সাধারণ শিক্ষার্থীদের গালাগাল শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে আমাদের একজনের কলার ধরে গেঞ্জি ছিঁড়ে ফেলে। ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাত্রলীগ হলের ভেতর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরস্ত্র ছিলেন। তিন দিক থেকে মহানগর ও অন্যান্য হল শাখা ছাত্রলীগকর্মীরা দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে আমাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে একযোগে হামলা চালায়। পিছু হটার সময় তন্নিসহ বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীকে তারা নির্মমভাবে মারধর করে। 

১৫ জুলাই হল এলাকায় হামলায় ছাত্রলীগের সহসভাপতি রবিউল হাসান রানা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু ইউনুস, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন রশীদ ও বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগ সভাপতি মেহেদী হাসান শান্তকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়। পরে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত এসে সবাইকে নিয়ে মল চত্বরের দিকে যান। হামলার সময় কয়েকজনকে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতেও দেখা যায়। 

নারী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হামলা
হলপাড়ায় পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মেয়েদের নিয়ে মূল মিছিল মল চত্বরের দিকে পিছিয়ে আসে। আগে থেকেই মধুর ক্যান্টিনে লাঠিসোটা, স্টিলের পাইপ, হকিস্টিক, মোটা কাঠ নিয়ে দক্ষিণ মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পির নেতৃত্বে অবস্থান করছিল ঢাকা দক্ষিণ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও বিপুলসংখ্যক বহিরাগত। তারা প্রায় সবাই হেলমেট পরিহিত ছিল। 

শিক্ষার্থীরা মল চত্বরে এলে তাদের ওপর একযোগে হামলা চালায় তারা। এ ছাড়া সূর্য সেন হল, প্রশাসনিক ভবন, ভিসি চত্বর থেকে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত লাঠিসোটা, স্টিলের পাইপ নিয়ে হামলে পড়লে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। 

এ সময় ভিসি চত্বর হয়ে ফুলার রোডের দিকে যেতে শুরু করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। বেশি বিপাকে পড়েন মেয়ে শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত সরে যেতে পারছিলেন না। বিশেষত মেয়েদের দৌড়ে দৌড়ে হকিস্টিক-লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে ছাত্রলীগ কর্মী ও বহিরাগতরা। বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন রুমন লাঠি হাতে ছাত্রীদের পেটান। 

মল চত্বর থেকে দৌড়ে শিক্ষার্থীরা ভিসি চত্বরের দিকে যান। সেখানেও তাদের পেছন পেছন দৌড়াতে দৌড়াতে মারতে থাকে মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ভিসি চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআরটিসির একটি ডাবল ডেকার বাস দাঁড়িয়েছিল। সেই বাসে আত্মরক্ষার্থে উঠে পড়েন ৫০-৬০ জন নারী শিক্ষার্থী। তাদের বাস থেকে নামিয়ে এনে পেটাতে থাকে ছাত্রলীগের হামলাকারীরা। 

ছাত্রলীগের হার
অতর্কিত হামলায় ছাত্রলীগ সেদিন শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার পর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ও রাজিবুল ইসলাম বাপ্পির নেতৃত্বে দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের ক্যাম্পাসজুড়ে মহড়া দিতে দেখা যায়। অন্যদিকে সৈকতও দলবল নিয়ে মহড়া দেন। তারা যাকে পায় তাকে পেটায়।

পরে কার্জন হল এলাকায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের তিনটি হলের আন্দোলনকারীরা একত্রিত হন। ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ ভাঙচুর করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নেতৃত্বে মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ হলগুলো ঘেরাও করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা হলের ছাদ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হল দখলে নেয়।

সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে শামসুননাহার হলের ছাত্রী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের  সমন্বয়ক সানজানা আফিফা অদিতি সমকালকে বলেন, মিছিল নিয়ে সূর্য সেন হলের কাছে পৌঁছালে মধুর ক্যান্টিন ও শ্যাডোর দিক থেকে কিছু ছেলেমেয়ের ওপর সরাসরি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। হামলায় মল চত্বরে তার হাঁটুতেও ইট এসে লাগে। পরে ঢামেকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেখেন সেখানে ছাত্রলীগ রামদা হাতে অবস্থান করছিল। 

তিনি আরও বলেন, ‘১৫ জুলাই মেয়েদের ওপর ছাত্রলীগের এই নগ্ন হামলা সবার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে এবং এটি আন্দোলনকে অনেক বেশি ত্বরান্বিত করে। মূলত এই হামলার ক্ষোভ থেকেই ১৬ জুলাই থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আরও জোরালোভাবে রাস্তায় নেমে আসে।’

অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে। এর সুপারিশে ১৫ জুলাইয়ের হামলায় জড়িত ছাত্রলীগের ১২৮ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মামলা করে ছাত্রলীগের ৩৯১ নেতাকর্মীকে আসামি করেন। সেই মামলা এখনও চলছে। ৭০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হামলায় উস্কানির তথ্য পেয়েছিল কমিটি। তাদের তিনজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে দুজনকে। বাকিরা শাস্তি পাননি। 

 

আরও পড়ুন

×