চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান
মিলনের খোঁজ এখনও মেলেনি, বাবাকে খুঁজছে ছোট্ট মারিয়াম
মিলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ঢাকার আশুলিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন
মনিরুজ্জামান মিলন
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সেই সময় মানসুরা মারিয়ামের বয়স ছিল ১১ মাস। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের গভীরতা বোঝার মতো বয়স হয়নি তার। মানসুরার বয়স এখন প্রায় তিন বছর। কথা বলতে শিখেছে, প্রশ্ন করতে শিখেছে। আশপাশের সমবয়সী শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে হাঁটে, খেলাধুলা করে, আদর পায়, তখন অপলক তাকিয়ে থাকে মারিয়াম। বাবার আদরের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। বাবার স্নেহের আকাঙ্ক্ষায় ছুটে গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘সবার বাবা আছে। আমার নেই কেন? ওদের বাবা আদর করে। কোলে নেয়। আমি বাবার কাছে যাবে।’
ছোট্ট মেয়ের এমন প্রশ্নে বাকরুদ্ধ হয়ে যান মা সুবিতা খাতুন। ডুকরে কাঁদেন। মেয়েকে কীভাবে বোঝাবেন, তার বাবা আর কখনও ফিরে আসবে না।
মারিয়ামের বাবা মনিরুজ্জামান মিলন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার পর নিখোঁজ হন। তাঁর মরদেহও মেলেনি।
মনিরুজ্জামান মিলন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ঢাকার আশুলিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। মিলনের খোঁজে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল-মর্গসহ কত জায়গায় যে গেছেন, তবুও মেলেনি সন্ধান। পরিবার বলছে, জীবিত থাকলে অবশ্যই মিলন ফিরে আসতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরের পর আশুলিয়ায় জনতার আনন্দ মিছিলে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় সেদিন ৪৬ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে। অনেকেই নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া যায়। ৪৬ লাশের মধ্যে আশুলিয়া থানার সামনে একটি পিকআপে ১১টি লাশে আগুন ধরিয়ে দেয় পুলিশ। মিলনের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার জোড়গাছায়।
মরদেহ না পাওয়া এবং কবর দেখাতে না পারায় জুলাই শহীদের তালিকায়ও নাম ওঠেনি মিলনের। অবশ্য এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের তেমন আক্ষেপ নেই। মিলনের বড় ভাই কলেজশিক্ষক সামিউল ইসলাম মিল্টন সমকালকে জানান, সেই সময় জুলাই শহীদের তালিকায় মিলনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তারা মৃত্যুসনদ ও কবর কোথায় জানতে চেয়েছিলেন। মরদেহ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
সামিউল বলেন, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই আমাকে বলেছিল, জাল মৃত্যুসনদ বানিয়ে নিতে। রাজি হইনি। মিথ্যার আশ্রয় কেন নেব? আমার ভাইয়ের লাশই যখন পেলাম না, তখন এসব নিয়ে কী করব? লাশ না পাওয়ায় আশুলিয়া থানা মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) নেয়নি।
ছেলের শোকে কাতর মেরিনা বেগম। প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। গ্রামের বাড়িতেই থাকেন তিনি। সম্প্রতি মোবাইল ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। মিলনের প্রসঙ্গে কথা বলতেই কেঁদে ওঠেন। কান্না করতে করতে বলেন, ছেলের লাশটাও পেলাম না। আর পাব বলে মনেও হয় না। আমি কত হতভাগা, শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখতে পেলাম না।
তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন মিছিলে যাওয়ার আগে ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিলাম, যাসনে বাবা। শুনছি অনেক জায়গায় গোলাগুলি হচ্ছে। গুলিটুলি লাগবে। কথা বলতে বলতে ছেলে মিছিলে চলে যায়। পরে বিকেলে কল দিই আবার কথা বলার জন্য। আর কল ধরেনি।
জানা যায়, মিলনরা দুই ভাই ও এক বোন। বাবা প্রয়াত সুরুজ্জামাল ওরফে মজিরদ্দীন কৃষিকাজ করতেন। মিলন এইচএসসি পাস করার পর ঢাকার মিরপুরে গার্মেন্টস মেশিনারিজের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বগুড়ায় বিয়ে করেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তিনি আশুলিয়ার একটি ডাইং কারখানায় সিনিয়র মেকানিক পদে কাজ করতেন। স্ত্রী ও একমাত্র শিশু মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। আন্দোলন চলাকালে ২৮ জুলাই মিলনের স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান। তখন মিলন বাসায় একাই থাকতেন। প্রায় প্রতিদিন আন্দোলনে অংশ নিতেন। আন্দোলনে যাওয়ার আগে স্ত্রী সুবিতা খাতুনকে মোবাইল ফোনে জানিয়ে যেতেন।
৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ করার খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে আনন্দে মাতে মানুষ। আনন্দ মিছিল বের হয় সড়ক থেকে মহল্লা– সবখানে। আশুলিয়ায় আনন্দ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন মিলন। ওই মিছিলে হামলা ও গুলি চালায় পুলিশ। এই খবর পেয়ে স্বজনরা মিলনের মোবাইল ফোনে কল দেন। তবে তারা সাড়া পাননি। একসময় ফোন বন্ধ হয়ে যায়।
স্বজনদের দাবি, পুলিশ গুলি করে মিলনকে মারার পর লাশ গুম করে দিয়েছে।
মিলনের স্ত্রী সুবিতা গাজীপুরের টঙ্গীর একটি কলেজ থেকে এবার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন। মেয়ে মারিয়ামকে নিয়ে তিনি কখনও শ্বশুরবাড়ি, কখনও একই এলাকায় বাবার বাড়ি থাকেন। চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুবিতা জানান, মারিয়াম এখন বুঝতে শিখেছে। প্রায়ই বাবার খোঁজ করে। যখন খুব কান্নাকাটি করে তখন মোবাইল ফোনে বাবার ছবি দেখানো হয় মারিয়ামকে। ছবিতে চুমু দেয় আর বাবা-বাবা বলে ডাকতে থাকে। তখন তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না।
সমকালের সঙ্গে কথা বলার সময় সুবিতার গলা ভারী হয়ে যায়। কান্না করতে করতে বলেন, আমি স্বামী হারিয়েছি আর আমার মেয়ে বাবাকে। ওর কষ্টটা বুঝি। কিন্তু কিছুই করার নেই। মেয়ে আমার চোখের মুছে দিয়ে জানতে চায়, আম্মু– কী হয়েছে?
- বিষয় :
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান
- জুলাই আন্দোলন