অভিমত
শিক্ষার্থীরা পরীক্ষামন্ত্রী নয়, শিক্ষামন্ত্রী চান
শিখনকে ফোকাস করা যেখানে জরুরি, সেখানে মুখস্থবিদ্যাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৬ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১২:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
শুরুতেই বলা দরকার, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ইতিবাচক অনেক কাজ করছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে এবং ধীরে ধীরে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের। শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া এবং স্টার্টআপ তথা উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়কেও সামনে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের আয়োজন হতাশাজনক। তারা পরীক্ষার পুরোনো ধাঁচেই পড়ে আছে। পরীক্ষায় লার্নিং বা শিখনকে ফোকাস করা যেখানে জরুরি, সেখানে মুখস্থবিদ্যাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তার আলোকেই সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন কিংবা নকলের হাইপ তোলা হচ্ছে। এতে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা কিংবা চিন্তা প্রকাশের সুযোগ কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষামন্ত্রীর বিষয়ে সেটিই বলেছে, ‘তিনি পরীক্ষামন্ত্রী, আমাদের দরকার শিক্ষামন্ত্রী’।
বস্তুত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যেভাবে রাস্তায় নেমেছে, তার কারণ দৃশ্যত বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়া হলেও বলা যায়, এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং পরীক্ষার অব্যবস্থাপনাও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তৃতায় নানা বিষয়ে তাদের ক্ষোভ ঝরে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের আস্থায় না নিয়ে পরীক্ষার হলে লাগানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। শুধু তাই নয়, ‘নকল প্রতিরোধে’ যেভাবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, তাও শিক্ষার্থীদের ভিকটিম বানানোর মতোই। হঠাৎ করে যথাযথ সময় ও প্রস্তুতি না নিয়েই সকল বোর্ডে একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জলভোগান্তির মধ্যে পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখেছে, প্রশ্নে ভুল। এসব মিলেই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ অমূলক নয়।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রকৃতির প্রতিকূল রূপ দেখা গেছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হয়েছে। তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সরকার চট্টগ্রামের পাঁচটি জেলার পরীক্ষা সঠিক সময়ে স্থগিত করেছে বটে, কিন্তু গত সোমবারের পরীক্ষা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিশেষ করে ঢাকায় রোববারের রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা প্রায় ডুবে যাওয়ার পর সোমবারের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। শিক্ষার্থীরা গুরুতর ভোগান্তির শিকার হয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে সময়মতো পৌঁছাতে না পেরে মানসিক চাপে ভেঙে পড়েছে পরীক্ষার্থীরা।
প্রকৃতির এই বৈরিতা ও মানবিক বিপর্যয় উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখতে পায়, সরবরাহকৃত প্রশ্নপত্রে ভুল। সব মিলিয়ে পরীক্ষা হলের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশাজনক ছিল। এই জলভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার তীব্র প্রতিক্রিয়াই তাদের ঘর থেকে রাজপথে বের করে এনেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তৃতায় এবং প্ল্যাকার্ডে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের সঙ্গে উঠে এসেছে, তা হলো পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশাসনের অতিরিক্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ নজরদারি ব্যবস্থা। নকল প্রতিরোধ করার নামে এবার পরীক্ষাকক্ষে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ১৬-১৮ বছরের একজন শিক্ষার্থী, যে এমনিতেই জীবনের অন্যতম বড় একটি পাবলিক পরীক্ষার চাপে রয়েছে, তার সার্বক্ষণিক নড়াচড়া ক্যামেরায় ধারণ করা বেমানান। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, নকল ঠেকানোর নামে তাদের ঢালাওভাবে ‘অপরাধী’ বা ‘ভিকটিম’ বানানো হয়েছে, যা তাদের আত্মসম্মানে আঘাত হেনেছে। এটা হয়েছে আমাদের শিক্ষাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিক বানানোর কারণে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে কেবল পরীক্ষা পেছানো বা পদত্যাগের দাবি হিসেবে দেখলেও ভুল হবে। আন্দোলনরতদের চোখে-মুখে ও বক্তৃতায় যে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে, তা আসলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক ধরনের অনাস্থা। বছরের পর বছর শিক্ষাক্রমের ঘন ঘন পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁসের আতঙ্ক, খাতা মূল্যায়নে চরম অসংগতি এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার যে সংস্কৃতি শিক্ষা প্রশাসনে গড়ে উঠেছে–এটি তারই সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া।
শিক্ষার্থীদের আবেগ, অনুভূতি ও মানবিক সংকটকে বিবেচনা করার মতো সংবেদনশীলতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা যখন দেখে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো শোনার মতো কেউ নেই, তখন তারা রাজপথকে বেছে নিতে বাধ্য হয়।
আমাদের সংকটের গোড়ায় হাত দিতে হবে। শিক্ষায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জরুরি। আমাদের পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে সরকার ইতোমধ্যেই চিন্তা করেছে, এটা ইতিবাচক। সংসদে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুনে এইচএসসি পরীক্ষা হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবর্ষ ও একাডেমিক ক্যালেন্ডারের মধ্যে সমন্বয় দরকার। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি এবং জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো। অস্ট্রেলিয়ায় জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে খোলে, এখানে সমন্বয় আমরা দেখি। বর্তমানে জুনে পরীক্ষা নেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের জীবনের ছয়টি মাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শীতকাল অর্থাৎ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে সেশন শুরু করা ভালো, কারণ ডিসেম্বরে আবহাওয়া অনুকূল থাকে।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা উচিত। এই আলোচনায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং তাদের অভিভাবক-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে বসা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এদের সবাইকে নিয়ে সরাসরি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন, যাতে তারা তাদের কষ্টের কথাগুলো বলার সুযোগ পায়।
এই ধরনের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সুযোগসন্ধানীরা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। সড়কের যে কোনো আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষের অনেক কষ্ট হয়, রাজধানীতে যানজটের সৃষ্টি হয়। আবার আন্দোলনকারীদেরও মূল্যবান সময় অপচয় হয়, সুতরাং আলোচনার বিকল্প নেই।
শিক্ষার্থীদেরও আচরণে সংযত হতে হবে, বাড়াবাড়ি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। এক জায়গায় আমরা দেখেছি, নকলের জন্য তারা পরীক্ষার হল ভেঙেছে, এমনটা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীদের প্রধান কাজ পড়ালেখা, শিখনের প্রতিই তাদের মনোযাগী হতে হবে।
তবে শিক্ষা প্রশাসনকে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষা নিতেই হবে। শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিয়ে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সংবেদনশীল ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা দরকার।
এটাও বলা দরকার, এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর আগেই আমরা দেখেছি, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিদিন যে সংখ্যায় শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকছে, তাও উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের এভাবে ঝরে পড়ার কারণগুলো গবেষণা ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় বের করে তার টেকসই সমাধানে হাত দিতে হবে। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্ন পদ্ধতিরও সংস্কার জরুরি। শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, শিক্ষামন্ত্রীকে ‘শিক্ষামন্ত্রী’ হয়ে উঠতে হবে। দুই যুগ আগের সেই নকলের জুজু এখন দেখানোর সময় নয়। জাতি প্রত্যাশা করে, শিক্ষামন্ত্রী সময়ের চাহিদা মাথায় রেখে শিক্ষা পরিকল্পনা করবেন ও বাস্তবায়ন করবেন এবং সকল অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবেন।
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ: অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (আইইআর)
- বিষয় :
- অভিমত
- পরীক্ষা
- শিক্ষা
- শিক্ষামন্ত্রী