মধ্যরাতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
অভিযোগ বহিষ্কৃত যুবদল নেতা সুমনের বিরুদ্ধে
কাউসার মোল্লা
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর ভাসানটেক এলাকায় কাউসার মোল্লা নাম এক যুবককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার নেপথ্যে ছিল পুরোনো বিরোধের জের– এমনটাই বলছেন স্বজনরা। তারা জানান, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে পল্লবীর বাসা থেকে ডেকে নিয়ে ধামালকোট বাজার ও সংলগ্ন একটি বাসায় দুই দফায় মারধর করা হয়। শেষে দোতলা থেকে তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়।
স্বজনের দাবি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর আগে কাউসার হামলাকারী হিসেবে ভাসানটেক থানা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা রবিউল ইসলাম সুমনসহ কয়েকজনের নাম বলেছেন। সেই বক্তব্যের ভিডিও করেছে পুলিশ। আবার এ ঘটনায় করা মামলার বাদী আসামি হিসেবে কয়েকজনের নাম বললেও পুলিশ কাউকে আসামি করেনি। অবশ্য পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভাসানটেক থানার ওসি আসলাম হোসেন সমকালকে বলেন, বাদী যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই এজাহার নেওয়া হয়েছে। বাদী কাউকে আসামি করতে চাইলে পুলিশের বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এখন কেন তিনি মিথ্যাচার করছেন, সেটি বুঝতে পারছি না। আর পুলিশ কাউসারের কোনো বক্তব্য রেকর্ড করেনি। বরং তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই ব্যস্ত ছিল।
যুবদলের বহিষ্কৃত নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন একটি কথা আমরাও শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে।
কাউসারকে হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী মোছা. সুমার করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লকে ২৩ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাসায় পরিবার নিয়ে থাকতেন কাউসার। বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে ভাসানটেক থানার ৩ নম্বর ধামালকোট এলাকার সোবহান রোডে কাউসারকে সংঘবদ্ধভাবে মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসক তাঁর দুই পা ভাঙা, মাথার মাঝখানে কাটা জখমসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
সুমা গতকাল শনিবার সমকালকে বলেন, কাউসার ক্যাপ (টুপি) তৈরির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে সুমন একজনকে দিয়ে ফোন করিয়ে কাউসারকে ধামালকোট এলাকায় ডেকে নেন। এর পর বাজারের রাস্তায় ও সুমনের বাসায় নিয়ে তাঁকে বেধড়ক পেটানো হয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করার পর তাঁকে দোতলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়। তবে এসবের কিছুই আমি জানতাম না। আমার ফোনটাও কাউসার নিয়ে গিয়েছিল। পরে গভীর রাতে ভাসানটেক থানার এসআই আজাদ কল করে বলেন, আপনার স্বামীর অবস্থা খুব খারাপ, দ্রুত পঙ্গু হাসপাতালে আসেন। সেখানে গিয়ে আমি তাঁকে জীবিত অবস্থায় পাই। সে নিজে আমাকে এবং পুলিশকে বলেছে, সুমনসহ কে কে তাঁকে মেরেছে। পুলিশ সেই বক্তব্য ভিডিও করেছে মোবাইল ফোনে। পরে তো ভোরের দিকে সে মারা গেল। আমি থানায় গেলে পুলিশ একটা লিখিত এজাহারে আমার সই নেয়। আমি আসামির নামগুলো বলেছিলাম, কিন্তু পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় আসামি হিসেবে মামলা নিয়েছে।
নিহতের খালাতো ভাই মো. মিন্টু জানান, কাউসারের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মোল্লা ও মা খোদেজা বেগম মারা গেছেন। কাউসার দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ২০২২ সালে দেশে ফেরেন। আবারও বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সুমনের ভাই রাজু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় তাঁর সঙ্গে কাউসারের কী যেন ব্যবসা ছিল। সেই বিষয়ে মতানৈক্য থেকে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ওই সময় কাউসারকে হেরোইনসহ ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ৩১ বছরের সাজা হয়। তবে দুই-আড়াই বছর কারাগারে থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামিন পান কাউসার। সেই ক্ষোভ থেকে তিনি চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সুমনকে সেনাবাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেন। তখন ভাসানটেক থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকেও সুমনকে বহিষ্কার করা হয়।
স্বজনের বর্ণনা অনুযায়ী সোবহান রোডে সুমনের সেই বাসায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সেখানকার ভাড়াটিয়ারা ঘটনার বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। পরে অভিযুক্ত রবিউল ইসলাম সুমন ফোনে সমকালকে বলেন, ওটা আমার পৈতৃক বাড়ি। তবে আমি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকি। নির্বাচনের আগে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে এর পেছনে যে কাউসার মোল্লার হাত ছিল, তা আমি জানতাম না। স্থানীয়রা তাঁকে পিটিয়ে মেরেছে। আমি খবর পেয়ে পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।
এদিকে নিহত কাউসার মোল্লার বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্বজনের ভাষ্য, শত্রুতামূলকভাবে তাঁকে এসব মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
- বিষয় :
- হত্যা