প্রদর্শনী
অনুভূতির শৈল্পিক নির্মাণই ছিল নভেরার লক্ষ্য
জাতীয় জাদুঘরে ‘নভেরা’ শীর্ষক প্রদর্শনী দ্রোহী তারা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের জীবন ও সৃজন ভুবনকে নতুন করে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ‘নভেরা’ শীর্ষক এ আয়োজনে প্রদর্শন করা হচ্ছে নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, প্রদর্শনীর ক্যাটালগসহ তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র। ২১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টায় শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এ প্রদর্শনী।
গ্যালারিতে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, এটি শুধু শিল্পকর্ম প্রদর্শনী নয়, বরং একজন শিল্পীর জীবন, দর্শন ও সময়কে একসঙ্গে দেখানোর এক বিরল প্রয়াস। সব মিলিয়ে যেন নভেরার সৃষ্টিশীল জগতের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
দেয়ালে টাঙানো তথ্য-প্যানেলগুলো জানায়, দেশভাগ, উদ্বাস্তু মানুষের জীবন, ভাষা আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর শিল্পে শুধু মানুষের অবয়ব নয়, ইতিহাসের স্মৃতি, শ্রমের চিহ্ন এবং সময়ের অভিঘাতও সমানভাবে ধরা পড়ে।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ভাস্কর্যগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাস্তবের অনুকরণ নয়, বরং অনুভূতির নির্মাণই ছিল নভেরার লক্ষ্য। কোথাও মাতৃত্ব, কোথাও পারস্পরিক সম্পর্ক, কোথাও আবার শূন্যতার মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের প্রশ্ন উঠে এসেছে। সরলরেখা, বিমূর্ত আকার এবং ফাঁকা জায়গার সচেতন ব্যবহার তাঁর শিল্পভাষাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। একই সঙ্গে তাঁর রঙিন চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে মানুষ, প্রকৃতি ও স্মৃতির স্বপ্নময় জগৎ, যেখানে রঙ হয়ে উঠেছে অনুভূতির আরেক ভাষা।
প্রদর্শনীতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে নভেরা আহমেদের শিল্পভাবনা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি ভাস্কর্যকে নিছক কারিগরি দক্ষতার প্রদর্শন হিসেবে দেখেননি। ব্রোঞ্জ, সিমেন্ট, পাথর, কাঠ কিংবা শিল্পকারখানার ধাতব উপকরণ– সবকিছুকেই তিনি শিল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে নির্মিত তাঁর ভাস্কর্য যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের এক শক্তিশালী শিল্পরূপ।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন, প্রাচীন প্রতীক ও আন্তর্জাতিক আধুনিক শিল্পভাবনার অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল নভেরার কাজে। তাঁর শিল্পে যেমন ইউরোপীয় আধুনিকতার ছাপ রয়েছে, তেমনি রয়েছে মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির গভীর অনুরণন।
সবার জন্য উন্মুক্ত এ প্রদর্শনীতে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নানা বয়সী মানুষ আসছেন। এর মাঝে শিক্ষার্থী ও শিল্পমনা মানুষের সংখ্যাই বেশি। ইউডা থেকে আসা কাজল বলেন, আমি তাঁর সিমেন্টে তৈরি ‘কম্পোজিশন’ ভাস্কর্যটি দেখছিলাম। আসলে নভেরা আহমেদ তাঁর কাজে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সংযুক্ত থাকাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
চাকরিজীবী রায়হান মাহমুদ বলেন, মা ও শিশুদের তিনি যেভাবে শিল্পে তুলে ধরেছেন, তা দেখলে প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়।
নভেরার চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় রঙের উৎসবের কথা। ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক রঙে আঁকা ‘কথোপকথন’ বা ‘অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা’ চিত্রকর্মগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
নভেরা আহমেদ শুধু একজন আধুনিক ভাস্করমাত্র নন। যে সমাজ নারীকে নির্দিষ্ট ছাঁচে দেখতে অভ্যস্ত ছিল, সেখানে নিজের জীবন, পোশাক, শিল্পচিন্তা ও সৃজনশীলতাকে স্বাধীন ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন তিনি। গ্যালারিতে প্রদর্শিত নভেরার ব্যবহৃত জিনিসপত্র সেটাই মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ভাস্কর্যের নীরবতা আজও দর্শককে প্রশ্ন করতে শেখায়। তাঁর শিল্প মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতা কখনও শুধু একটি শিল্পধারা নয়। এটি সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্ব ভাষা নির্মাণের আরেক নাম; যা এই প্রদর্শনীর প্রতিটি স্থানে বিদ্যমান।
- বিষয় :
- প্রদর্শনী