ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

অধ্যাদেশ বাতিল

দুদকের শক্তি আরও কমেছে

দুদকের শক্তি আরও কমেছে
×

 হকিকত জাহান হকি 

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১১:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ‘খোঁড়া প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছে। ওই অধ্যাদেশে মানি লন্ডারিং আইনের সাতটি ধারা (সম্পৃক্ত অপরাধ) দিয়ে দুদককে শক্তিশালী করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস না হওয়ায় দুদক ওই সাতটি সম্পৃক্ত অপরাধ তদন্ত করতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে দুদককে আইনিভাবে শক্তিশালী করার পর আবার পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করা হয় ২০০২ সালে। তখন থেকে দুদককে আইনটির সব সম্পৃক্ত অপরাধ (ধারা) তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় মানি লন্ডারিং অপরাধে কমিশনের মামলার সাজার হার ছিল শতভাগ।  

২০১৫ সালে আইনটি সংশোধন করে দুদককে মাত্র একটি ধারা ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ দেওয়া হয়। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদক-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে জারি করা অধ্যাদেশে সংস্থাটিকে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত সাতটি ধারা দেওয়া হয়। আগের ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ ধারাসহ মোট ধারা হয়েছিল আটটি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস না হওয়ায় দুদক এখন মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত একটি ধারা নিয়েই কাজ করছে। 

যদিও এরই মধ্যে দুদক আইন-২০০৪ সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুদক-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদন আইন সংশোধনের সময় কতটুকু বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

জানা যায়, দুদক আইন ২০০৪ অনুসারে, দুদকের সর্বোচ্চ কাঠামো ‘কমিশন’ গঠন করা হচ্ছে। এতে একজন চেয়ারম্যান, দুজন কমিশনার নিয়োগ করা হবে। কমিশনের ওই প্রতিবেদনে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করার কথা বলে অধ্যাদেশও জারি করা হয়েছিল। আইন পাস না করিয়ে এখন পুরোনো নিয়মেই কমিশন হচ্ছে। ফলে পুরোনো ধারাতেই চলছে দুদক।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুদক-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মানি লন্ডারিং আইনের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ধারা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করা হয়েছিল। এখন সামান্য ক্ষমতাও সংস্থাটির হাতে নেই।

তিনি বলেন, সরকার এরই মধ্যে দুদক আইন সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে। এই আইন যখন সংশোধন করা হবে, তখন যেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের কমিশনের প্রতিবেদন, সুপারিশগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়। 

২০১৫ সালে সংশোধনের আগ পর্যন্ত মানি লন্ডারিং আইনের ধারা ছিল ২৭টি। পরে সাইবার ক্রাইম, পর্নোগ্রাফি অপরাধ যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট ধারা ২৯টি। এই ২৯ ধারা থেকে ওই অধ্যাদেশে দুদকের জন্য সাতটি ধারা যুক্ত করা হয়েছিল। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে দুদক দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা, জালিয়াতি-সংক্রান্ত অপরাধ তদন্ত করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে দুদকের জন্য শর্ত রয়েছে যে, শুধু সরকারি কর্মচারী ও ব্যাংকারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তদন্ত করা যাবে। ৪২০ ধারা অনুযায়ী, সরকারি সম্পত্তি নিয়ে প্রতারণা, জালিয়াতির অভিযোগও তদন্ত করতে পারছে দুদক। 
মানি লন্ডারিং আইনের প্রতারণা, জালিয়াতির যে ধারা দুদক ব্যবহার করে আসছিল, তাতে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত সরকারি, বেসরকারি এমনকি দেশে সংঘটিত এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধেও তদন্ত করতে পারত।     

দুদকের উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, মানি লন্ডারিং আইনের পর্যাপ্ত ধারা ব্যবহার করতে না পারায় দুদকের কাজের পরিধি সংকুচিত হয়ে এসেছে। মানি লন্ডারিংবিষয়ক অনেক অভিযোগ দুদকে আসে। সেগুলো তপশিলভুক্ত না হওয়ায় তদন্ত করা যাচ্ছে না। তদন্তের সুপারিশ করে ওই সব অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

দুদক জানায়, এর আগে দুদক মানি লন্ডারিং আইনের প্রতারণা, জালিয়াতির ধারা ব্যবহার করতে পারায় ২০১২ সালে ডেসটিনি, ইউনিপে-২, যুবকসহ বেসরকারি খাতের নানা অভিযোগের তদন্তে সাড়া ফেলেছিল। বর্তমানে এই ধারাগুলো ব্যবহার করতে না পারায় দুদক পানামা পেপার্সসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারছে না।   

সেই সাতটি ধারা 
অধ্যাদেশে দুদককে যে সাতটি ধারা দেওয়া হয়েছিল সেগুলো হলো– দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চোরাচালানি ও শুল্ক-সংক্রান্ত অপরাধ, কর-সংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজিবাজার সম্পর্কিত তথ্য-সংক্রান্ত অপরাধ। 

এর আগে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে দুদককে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত শুধু একটি ধারা ‘ঘুষ ও দুর্নীতি’ দেওয়া হয়েছিল। দুদকের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ওই সময় সরকারের অন্য ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে মানি লন্ডারিং আইনের বিভিন্ন ধারা তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো– পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কাস্টমস, পরিবেশ অধিপ্তর এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। 
জানতে চাইলে দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম  বলেন, অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে পাস করা হয়নি বলে সম্পৃক্ত অপরাধগুলো রাখা হবে না– বিষয়টা এমন নয়। সরকার প্রয়োজন মনে করলে যে কোনো সময় ওই সব অপরাধ তদন্তের জন্য দুদক আইনে যুক্ত করতে পারে।

আরও পড়ুন

×