ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

জামায়াতে ইসলামী

একলা চলো নীতিতে শরিকরা নাখোশ

স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করতে চায় জামায়াত

একলা চলো নীতিতে শরিকরা নাখোশ
×

ফাইল ছবি

রাজীব আহাম্মদ 

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী গত নির্বাচনের আগে থেকে আলাদা মেরুতে অবস্থান করছে। দুই দলের নেতৃত্বে আলাদা জোটও রয়েছে। তবে ভোটের পর ধীরে ধীরে দুই জোটেই প্রকাশ পাচ্ছে নানা সংকট। দুই জোটেই প্রধান শরিকের বিরুদ্ধে অন্য দলগুলোর নানা ধরনের অভিযোগ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে উভয় জোটে জটিলতা আরও বেড়েছে

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে আসতে কওমি ধারার দলগুলোর ওপর রয়েছে হেফাজতে ইসলামের চাপ। হেফাজতের এই অবস্থানকে জোট ভাঙতে বিএনপির ‘চাল’ হিসেবে দেখছে জামায়াত। যদিও আসছে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে একলা চলো নীতিতে জামায়াতের ওপর বেজার শরিক নেতারা। 

তাদের ভাষ্য, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলনে শরিকদের সামনে রাখা হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা করছে না জামায়াত। ত্রয়োদশ সংসদে আসন না পাওয়া খেলাফত আন্দোলন এরই মধ্যে জোট ছেড়েছে। গতকাল শনিবার বরিশালে জোটের বিভাগীয় সমাবেশে যায়নি খেলাফত মজলিস। 

মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও ১১ দলের অতিসক্রিয়তায় নাখোশ। জামায়াতের সঙ্গে জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এনসিপির বাদানুবাদ রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ক্যাম্পাসগুলোতে এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির বিরোধ রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে। সংসদে ভূমিকা, সরকারের সমালোচনায় কঠোর না হওয়া এবং স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের নীতিতে ক্ষুব্ধ দলটি। একই দৃষ্টিভঙ্গি এবি পার্টিরও। 

তবে বাকি পাঁচ শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং লেবার পার্টির আপত্তি নেই জামায়াতের অবস্থান নিয়ে। এ দলগুলোর সংসদে প্রতিনিধিত্বও নেই।

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে এনসিপিকে ৩০, বাংলাদেশ খেলাফতকে ২৪, খেলাফত মজলিসকে ১৪, এলডিপিকে ৭, এবি পার্টি ও নেজামে ইসলামকে ৩টি করে এবং বিডিপিকে দুটি আসন ছেড়েছিল জামায়াত। আসন পায়নি খেলাফত আন্দোলন, লেবার পার্টি ও জাপগা। 

তবে কিছু আসনে জোটের একাধিক দলের প্রার্থী ছিল। আবার ছেড়ে দেওয়া কিছু আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা থেকে যান। যেমন এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী থেকে যান। নেজামে ইসলাম, এলডিপি ও খেলাফত মজলিসের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটে। জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬, বাংলাদেশ খেলাফত ২ এবং খেলাফত ১টি আসনে জয়ী হয়।

খেলাফত আন্দোলনকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সংসদের উচ্চকক্ষে আসন দেওয়া হবে। উচ্চকক্ষ হবে কিনা– এ নিশ্চয়তা না থাকায় দলটি জোট ছেড়ে চলে গেছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে। খেলাফত মজলিসও ১১ দলের কর্মসূচিতে থাকছে না। দলটির মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের সমকালকে বলেন, সংসদে একসঙ্গে থাকলেও আপাতত জোটের কর্মসূচিতে থাকছি না।

কেন থাকছেন না প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনও বলার সময় আসেনি। সময় হলে সব খোলাসা করা হবে। খেলাফত মজলিস গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষেই আছে। তবে জোটের কর্মসূচিতে থাকছে না। 

জোট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত ও এনসিপি বাদে অন্য দলগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জোটের কর্মসূচিতে এই দুই দলের নেতাদের সভাপতি, প্রধান অতিথি হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু খেলাফত মজলিসসহ বাকি দলগুলোকে একই রকম গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শীর্ষ নেতা ছাড়া অন্য কাউকে সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয় না।

১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের অবশ্য দাবি জোটে ক্ষোভ নেই। তিনি বলেন, সামান্য মান-অভিমান আছে। এগুলো সব জোটেই থাকে। যা কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে, তা একসঙ্গে বসলে ঠিক হয়ে যাবে। 

হেফাজতের চাপে কওমি ধারার দল, জামায়াতের সন্দেহ 
এখনও জামায়াত জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের দুই অংশ এবং নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা একাধারে হেফাজতেরও নেতা। হেফাজত এবং দলগুলোর নেতারা সমকালকে বলেছেন, জমিয়ত বিএনপির সঙ্গে থাকায় এবং কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে থাকায় আলেম-ওলামাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বাহাস হচ্ছে। 

চরমোনাই ইসলামী আন্দোলন আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতায় জামায়াত ছাড়ার পর তাদের সঙ্গে বিরোধ হচ্ছে অন্যদের। ঐক্যের জন্য চলতি মাসের শুরুতে রাবেয়াতুল ওয়াজিনের ব্যানারে রাজধানীতে সম্মেলন হলেও মঞ্চেই বিরোধ তৈরি হয় বিএনপি ও জামায়াত প্রশ্নে। এতে প্রভাব পড়ছে কওমি মাদ্রাসা পরিচালায়। 

জামায়াতকে কওমি মাদ্রাসা বিরোধী হিসেবে দেখা হয়। সংসদে দলটির এমপিরা কওমি মাদ্রাসায় সরকারি বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। হেফাজত-সংশ্লিষ্টদের সন্দেহ এর মাধ্যমে জামায়াত কওমি মাদ্রাসাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কওমি আলেমরা চান না, আলিয়ার মাদ্রাসার মতো কওমিতেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ আসুক। আলিয়া মাদ্রাসা ‘জামায়াত নিয়ন্ত্রিত’ হিসেবে পরিচিত।

দেওবন্দের অনুসারী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতের জামায়াতের অনুসরণ করা মওদুদীবাদের ঘোরবিরোধী। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজত-সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান। ওই বৈঠকে বলা হয়, জামায়াতের আকিদা ঢুকে যাচ্ছে মাদ্রাসায়। এরপর নিয়ন্ত্রণও চলে যাবে। তাই আকিদা ও কওমি মাদ্রাসা রক্ষায় দেওবন্দের অনুসারী দলগুলোকে জামায়াত ছাড়তে হবে। 

খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম নেতারা এই বৈঠকে হেফাজত আমিরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কওমি ধারার দলগুলোর ঐক্যে তারাও থাকবে। দেওবন্দের উসুলের বাইরে তারা যাবেন না।

হেফাজতের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব এবং কওমি মাদ্রাসার মুরব্বি হিসেবে পরিচিত আলেমরা দশকের পর দশক মওদুদীবাদের সমালোচনা করেছেন। সেই ঘরানার দলগুলোর জামায়াতের জোটে থাকা তাদের আদর্শিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে হেফাজতের আমির ও মহাসচিব জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হেফাজত আমির জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া দেন। যদিও সংগঠনটির নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী সমকালকে বলেছেন, হেফাজত তার অরাজনৈতিক চরিত্র থেকে কওমি ধারার দলগুলোকে একসঙ্গে থাকার নসিহত দিয়েছে।

তবে হেফাজতের এই অবস্থানকে সরকারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে জামায়াত। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, হেফাজতের আমিরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা সবাই বিএনপির ঘনিষ্ঠ। বিএনপির এক প্রার্থী ঋণখেলাপি হয়ে আদালতের রায়ের শপথ নিতে না পারায় তাঁর জন্য প্রকাশ্যেই দোয়া করেন হেফাজত নেতারা। জামায়াতকে অনৈসলামিক দল বলে আখ্যা দেন। আবার গুলশানে এসে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে কওমি ধারার দলগুলোকে জামায়াতের জোট থেকে বের করে নেওয়ার প্রচেষ্টায় সরকারের মদদ রয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে দুর্বল করতেই সরকার তা করছে।

স্থানীয় সরকার নিয়ে শরিকদের ক্ষোভ
দেশের সব সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে দল সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করেছে জামায়াত। প্রার্থীরা মাঠে কাজ শুরু করেছেন আগে থেকেই। আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদের তপশিল ঘোষণা হতে পারে। অক্টোবর থেকে নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছর ধরে ধাপে স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে ভোট হবে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।

সব জায়গায় জামায়াত এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করায় নাখোশ শরিকরা। তারা স্থানীয় নির্বাচনেও জোট চান। বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য জুলাই সনদের পক্ষে সক্রিয় রয়েছে। 

একাধিক দলের নেতা সমকালকে বলেন, জামায়াত শরিকদের জুলাই সনদ ইস্যুতে পাশে রেখে যদি স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করে, তাহলে শরিকদের কী লাভ?
এনসিপি ছয়টি সিটি করপোরেশনের জন্য সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। ১০০ উপজেলা এবং পৌরসভাতে সম্ভাব্য প্রার্থীর নামও তালিকা করে রেখেছে। এ দলটি এককভাবে নির্বাচনের কথা বলছে, তবে তারাও চায় স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকুক। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচন করবেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সাবেক উপদেষ্টাকে সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী করা হয়নি।

জামায়াত দক্ষিণ সিটিতে গণঅভ্যুত্থানের আরেক ছাত্রনেতা আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা না দিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম সম্প্রতি ছাত্রজীবনের ইতি টেনে শিবির থেকে বিদায় নিয়েছেন। ভিপি পদের মেয়াদ শেষে যোগ দেবেন জামায়াতে। তাই দক্ষিণ সিটি অন্য কাউকে দিতে রাজি নয় জামায়াত।

দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সমকালকে বলেন, জামায়াত যখন বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল, তখনও স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করেছে। জাতীয় নির্বাচনে জোট কাজ করলেও স্থানীয় নির্বাচনে তা হয় না। 

জামায়াত অতীতে একবার সিলেট সিটিতে মেয়র প্রার্থী দেওয়া ছাড়া সবসময় বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে– এ তথ্য দেওয়ার পর আবদুল্লাহ তাহের বলেন, তখনও দেখা গেছে জোট খুব একটা কার্যকর হয় না। তার পরও স্থানীয় নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে জোট হতে পারে, যা জেলা বা মহানগর পর্যায়ে ঠিক হবে।

আরও পড়ুন

×