ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

বিএনপি

আন্দোলনের সঙ্গীদের মধ্যে অসন্তোষ

তৃণমূল পর্যন্ত হিস্যা চায় শরিকরা

আন্দোলনের সঙ্গীদের মধ্যে অসন্তোষ
×

ফাইল ছবি

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী গত নির্বাচনের আগে থেকে আলাদা মেরুতে অবস্থান করছে। দুই দলের নেতৃত্বে আলাদা জোটও রয়েছে। তবে ভোটের পর ধীরে ধীরে দুই জোটেই প্রকাশ পাচ্ছে নানা সংকট। দুই জোটেই প্রধান শরিকের বিরুদ্ধে অন্য দলগুলোর নানা ধরনের অভিযোগ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে উভয় জোটে জটিলতা আরও বেড়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে যেসব দল বিএনপির শরিক ছিল, তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের সময় এবং সরকার গঠনের পর যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে শরিকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যায় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিএনপির মিত্র দলগুলোর একাধিক নেতা জানান, ক্ষোভ-অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট দূরত্বের ব্যাপারে এরই মধ্যে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। কেউ কেউ বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও দেখা করেছেন। সব ঠিক থাকলে ২০ জুলাই বিএনপির চেয়ারম্যানের নৈশভোজ হবে– এমনটাই জানানো হয়েছে শরিক দলগুলোর নেতাদের।

জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের ১০টির মতো আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। এর মধ্যে নিবন্ধিত শরিকদের জন্য আটটি আসন ছাড়া হয়। অনিবন্ধিত দুটি দল ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ ছাড়া চার নেতা বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। এর মধ্যে জয়ী হয়ে সরকারে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। সরকারের অংশ এই তিন দল বাদে ১২ দলীয় জোট, হেফাজতে ইসলাম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ অন্যান্য শরিক দলগুলোর মূল্যায়ন না থাকায় ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশাল অংশে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

অন্যদিকে, মিত্র দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য কোনো আসন ছাড় দেয়নি বিএনপি। এককভাবে নির্বাচনে লড়াই করে তারা জিততে পারেননি। এ নিয়ে দুদলের নেতাকর্মীরা বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ। 

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব সমকালকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াত পেয়েছি, কিন্তু যাচ্ছি না। চিঠি দিয়ে কারণ জানিয়ে দিয়েছি। তবে জাতীয় কোনো সংকটের সময় ঐক্যের ডাকে সাড়া দেবে জেএসডি।’ 

দলটির আরেক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস হলো। এখন পর্যন্ত একবারও খবর নিল না। দেশের প্রবীণ জাতীয় নেতা আ স ম আবদুর রব দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কেউ তাঁকে দেখতে পর্যন্ত এলো না।

গতকাল শনিবার ছোট ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া ছুটে যান। প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 
জানা গেছে, শরিকদের এই ক্ষোভ নিরসন ছাড়াও আগামী রাষ্ট্র বিনির্মাণে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলগুলোর বাইরে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এ নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। এ উদ্যোগ কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে নয়, বরং জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে বলে জানান শরিক দলের অনেক নেতা।

শরিক দলের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চাশের অধিক মিত্র দলকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে ছিল বিএনপি। এর মধ্যে অনেকে সরকারের অংশ হিসেবে আছেন মন্ত্রিসভায়, অনেকে দলের সমর্থনে এমপি হয়েছেন, অনেকে সমর্থন পেলেও জয়ী হতে পারেননি। আবার অনেক দলকে সমর্থনও জানানো হয়নি। নির্বাচনে সমর্থন না পাওয়া এমন বেশ কয়েকটি দলের মধ্যে যেমন ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে, তেমনি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মিত্রদেরকে দেওয়া আশ্বাসের প্রতিফলন না পাওয়ার বেদনাও রয়েছে প্রায় সব শরিক দলের মধ্যে।

‘একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে সরকার’– বিএনপির এমন স্লোগান সামনে রেখে শরিক দলের অনেকে এখন চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ হতাশ হয়ে জোট রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। আবার কেউ নিজেদের মতো করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

কয়েকটি শরিক দলের নেতা জানান, যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে রাজপথে থেকে সরকার গঠনের পর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে সরকার পরিচালনায় শরিকদের ভূমিকা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হবে।

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সমকালকে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ পেয়েছি। আশা করছি, অনুষ্ঠানে যাব।’

গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘যমুনায় আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসব। এরই মধ্যে প্রতিটি দল থেকে পাঁচজনের নামের তালিকা নেওয়া হয়েছে। মূলত প্রধানমন্ত্রী কোন আঙ্গিকে কথা বলেন তা শুনব। সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আমরা সার্বিক পর্যালোচনা তুলে ধরব। আমাদের জন্য সরকার কী করতে পারে, আমরা সরকারের জন্য কী করতে পারি তা হয়তো আলোচনায় উঠে আসবে।’

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের শীর্ষ নেতা ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, শুধু দুয়েকটি দল থেকে কাউকে মন্ত্রিসভায় নিলেই কিন্তু জাতীয় সরকার হয় না। বিএনপি বলেছিল, একসঙ্গে আন্দোলন ও একসঙ্গে অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবে। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা উঠবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি নিজেই বলেছিল– তারা একসঙ্গে আন্দোলন এবং একসঙ্গে সরকার গঠন করবে। এ কথা তারা বারবার বলেছে। কিন্তু এখন দুয়েকটি দলকে মন্ত্রিপরিষদে স্থান দেওয়া হলো, বাকিদের খবর নেই। বিষয়টি তাদের স্মরণ করিয়ে দেব।’

গণঅধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমাদের দল অন্য শরিকের চেয়ে বড়। সারাদেশে কমিটি আছে। আমরা কিছু সুনির্দিষ্ট লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরতে চাই। আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মী আছে সারাদেশে। তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদায়ন, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।’

বামপন্থি রাজনৈতিক দল গণসংহতি আন্দোলনের বর্তমান নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে কীভাবে সরকারের সঙ্গে আরও ভালোভাবে কাজ করা যায়, সেসব বিষয় থাকবে আলোচনায়।

জানতে চাইলে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, ‘আমরা তো সব সময়ই তাদের সঙ্গে বসি। শরিক দল তো একটি নয়; অনেক। সবার সঙ্গে বসতে সময় লাগে। যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান।’

আরও পড়ুন

×