মোবাইলে, ওয়েবসাইটে তথ্য দিয়ে টাকা খোয়াচ্ছে মানুষ
প্রতারণার অভিযোগে দুটি মামলায় অন্তত ছয়জন গ্রেপ্তার
রাসেল মাহমুদ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে গত মে মাস থেকে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ট্রাফিক আইন অমান্য করায় গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৭০ দিনে প্রায় এক হাজার ৮০০টি মামলাও হয়েছে। এর মধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক প্রতারক চক্র। তারা সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নামে মামলাসংক্রান্ত ভুয়া এসএমএস পাঠাচ্ছে। এসএমএসের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের জাল ওয়েবসাইটে ঢুকলেই টাকা খোয়াচ্ছে মানুষ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এসএমএস পাওয়া ব্যক্তির ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের তথ্য এবং ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) সংগ্রহ করে তার ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতে একাধিক প্রতারক চক্র সক্রিয় আছে। এসব চক্রের মূল নিয়ন্ত্রণ বিদেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। দেশে থাকা তাদের এজেন্টরা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস সুবিধার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন ধাপে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করছে। গত মে মাসের শুরুতে সড়কে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ শুরুর পর থেকে এমন একাধিক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ মে শেখ জিয়ারত ইসলাম নামের একজন মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে একটি এসএমএস পান। এতে তাঁর ব্যবহৃত গাড়ির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করে জানানো হয়, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ অথবা আপিল না করলে অতিরিক্ত বিলম্ব ফি যোগ হবে এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা করা হবে। পাশাপাশি জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি ওয়েবসাইটের লিংকও দেওয়া হয়।
এরপর জিয়ারত ইসলাম ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন এবং জরিমানা পরিশোধের জন্য তাঁর ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেন। পরে মোবাইলে আসা ওটিপি দেন। এরপর প্রতারকরা তাঁর বিকাশের দুটি পার্সোনাল নম্বর থেকে দুই দফায় ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, বিআরটিএর নামে ভুয়া ওয়েবসাইট থেকে তাঁর কার্ডের তথ্য ও ওটিপি সংগ্রহ করে প্রতারণা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় মামলা হলে তদন্তে নেমে মো. জাহিদুল ইসলাম (৩৯), মো. ইফতেখার হাসান রায়হান (২১) ও রিপন (৩৮) নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। পুলিশ বলছে, তারা বিদেশি প্রতারক চক্রের হয়ে দেশে অর্থ সংগ্রহের কাজ করতেন।
একইভাবে গত জুন মাসে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে ট্রাফিক পুলিশের জরিমানা ও মামলাসংক্রান্ত এসএমএস পান। এসএমএসে দেওয়া লিংকে ঢুকে তিনি দেখতে পান, তাঁর অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিন হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে আরও এক হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এরপর তিনি একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তাঁর স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি দেন। পরে দেখতে পান জরিমানার অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে তিন লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন তিনি। পরে এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন– মো. রাব্বি শেখ, মো. রিয়াদ হোসেন ও মো. সাজ্জাদ হোসেন। পুলিশ জানায়, চক্রটির বিরুদ্ধে সিআইডির সিপিসিতে এ ধরনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
ডিবি ও সিআইডির তথ্যমতে, এআই ট্রাফিক মামলা চালুর পর একই কৌশলে একাধিক প্রতারক চক্র কাজ করছে। অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যারা কখনও ট্রাফিক আইন ভঙ্গও করেননি, তাদের কাছেও ভুয়া মামলাসংক্রান্ত এসএমএস পাঠানো হচ্ছে। অনেকেই তা বিশ্বাস করে কার্ডের তথ্য দিয়ে টাকা খুইয়েছেন।
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, এই প্রতারণা অন্তত তিন স্তরে পরিচালিত হয়। বিদেশে অবস্থানকারী মূল চক্র বিআরটিএর ওয়েবসাইটের আদলে জাল ওয়েবসাইট তৈরি করে এবং মানুষের মোবাইল নম্বরে এসএমএস পাঠায়। ভুক্তভোগী সেখানে কার্ডের তথ্য দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য ও ওটিপি বাংলাদেশে থাকা ‘অ্যাড মানি’ এজেন্টদের কাছে পাঠানো হয়। তারা এমএফএস মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করে আরেকটি চক্রের কাছে পৌঁছে দেয়। শেষ পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়।
ডিবি জানায়, চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও হংকংভিত্তিক প্রতারক চক্রের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। দেশে তাদের হয়ে কাজ করা আরও কয়েকজন এজেন্টকে শনাক্ত করা হয়েছে। গত জুন মাসে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন চীনে অবস্থানকারী মূল চক্রের নির্দেশনায় কাজ করছিলেন। টেলিগ্রামে চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
ডিএমপি ও সিআইডির তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে অন্তত ১০টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় অন্তত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার খান মাহমুদুল হাসান সমকালকে বলেন, ডিজিটাল সেবা চালু হলেই প্রতারক চক্র তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তাই অচেনা লিংকে প্রবেশ না করা, কার্ডের তথ্য ও ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করা এবং সরকারি বার্তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
আইন মেনে চলায় এখন এআই মামলা কমছে
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর সড়কে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে গত ৭ মে থেকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়েছে। ডিএমপির নিজস্ব অর্থায়নে দেশীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারের মাধ্যমে ২০টি এআই ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে বসিয়ে এর কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে ৪৬টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। আরও ২০০টি ক্যামেরা শিগগিরই বসানো হবে। নতুন সার্ভার মালয়েশিয়া থেকে কেনা হচ্ছে।
ডিএমপি জানায়, গত ৭ মে থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত এআই ক্যামেরা ব্যবহার করে ডিএমপিতে ট্রাফিকের প্রায় এক হাজার ৮০০টি মামলা দেওয়া হয়েছে। শুরুর দিকে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় শাহবাগের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল ও বাংলামটর মোড়ে। বর্তমানে ট্রাফিক আইন মেনে চলায় মামলার সংখ্যা কমে আসছে।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিকের মামলার বিষয়ে ডিএমপির এআই সংশ্লিষ্টরা জানান, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা কোনো পরিবহনের চালক ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে গাড়ির নম্বর, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে সার্ভারে দিলে সেখানে বিআরটিএ থেকে গাড়ির সব তথ্য চলে আসে। সেখানে অপরাধের ধরন, স্থান, সময় ও ছবি–ভিডিও দিলে অভিযোগপত্র তৈরি হয়। সেই অভিযোগপত্র ডাক বিভাগের মাধ্যমে গাড়ির মালিকের কাছে পাঠানো হয়। তখন গাড়ির মালিক ট্রাফিক বিভাগে এসে সেটা যাচাই করে মামলার জরিমানা দেন।
ডিএমপির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমীন আফরোজ সমকালকে বলেন, গাড়ির মালিককে ট্রাফিক বিভাগ থেকে বর্তমানে কোনো মেসেজ দেওয়া হয় না। সামনে মেসেজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করা হবে।