ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

নীতি সংলাপ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাতে উদ্বেগ

জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প খাতে উদ্বেগ
×

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাসের তীব্র সংকট ও বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটে দেশের শিল্প খাত কঠিন সময় পার করছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন; বাড়ছে খরচ, আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে রপ্তানির প্রতিযোগিতা। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়েছে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদেশি বিনিয়োগ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্পায়নের গতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা ও আমদানিনির্ভর নীতির কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক নীতি সংলাপে (পলিসি কনক্লেভ) এসব বিষয় উঠে আসে। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নেন।

শিল্প খাতের সংকটের চিত্র তুলে ধরে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে কোনো বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন না। নীতির স্বচ্ছতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা না থাকায় শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোলার খাতের শুল্কনীতিতেও অসংগতি রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় কয়লা উত্তোলনে আর দেরি করা উচিত নয়। নিজস্ব কয়লা কাজে লাগানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হবে। একই সঙ্গে তিনি স্থলভাগ ও সমুদ্রে খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।

ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান জানান, শিল্পের সমস্যা শুধু গ্যাসের ঘাটতি নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাব। ভোল্টেজের ওঠানামা ও আকস্মিক বিভ্রাটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ওষুধশিল্পে মাত্র কয়েক মিনিটের বিদ্যুৎ বিভ্রাটেও কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাচ বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফলে জেনারেটর ও ইউপিএসের পেছনে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে ক্রেতার ওপর চাপানো সম্ভব হয় না। এতে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো বিনিয়োগই আসবে না। স্থানীয় উদ্যোক্তারা কী পরিবেশে ব্যবসা করছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগে সেটিই পর্যবেক্ষণ করেন। বিদ্যমান শিল্পই যদি গ্যাসের অভাবে টিকতে না পারে, তবে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্রুত সরকারি জমি বরাদ্দের দাবি জানান।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মাহবুবুল আলম বলেন, শিল্পখাতে সবুজ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। ওয়ালটন নিজস্ব কারখানায় ২২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং ৫০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। অনেক উদ্যোক্তা গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পেয়ে কারখানা নির্মাণ করলেও পরে গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করতে পারেননি। ফলে আমদানি করা যন্ত্রপাতি অলস পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে পুরো ব্যাংকিং খাতই ঝুঁকিতে পড়বে।

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাস অনুসন্ধান এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক জানান, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে উদাসীনতা ছিল। এখন আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে অনশোর ও অফশোর– দুই ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে বর্তমানে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। তাই অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি উচ্চ ব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে অবসায়নের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১০০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫০টি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভারের কাজ চলছে। অফশোর বিডিং রাউন্ডেও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশের বিদ্যুৎ বিতরণে যুক্ত ছয়টি কোম্পানিকে ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহে থাকবে, আর বিতরণ বেসরকারি খাতে গেলে সেবার মান, জবাবদিহি ও বিল আদায় বাড়বে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের ব্যবস্থা করা হয়নি। খুলনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন না থাকায় কেন্দ্রটি কার্যত অচল হয়ে আছে। দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় দেশ আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে সিএনজি স্টেশন ও বাসা-বাড়িতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও মানুষ সড়ক অবরোধও করছে।

মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি এবং আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল বর্তমান সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। ক্লাস্টারভিত্তিক রুফটপ সোলার বাস্তবায়ন ও সৌর প্যানেল স্থাপনকারীদের কর-রেয়াত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
 

আরও পড়ুন

×