ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

কৃষির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধান রুটিন দায়িত্বের চক্করে

কৃষির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধান রুটিন দায়িত্বের চক্করে
×

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন স্থায়ী নেতৃত্ব ছাড়াই চলছে। কোথাও মহাপরিচালক, কোথাও নির্বাহী চেয়ারম্যান, আবার কোথাও পরিচালক পদে দেওয়া হয়েছে শুধু ‘রুটিন দায়িত্ব’। এতে গবেষণা পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই), তুলা উন্নয়ন বোর্ডসহ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ দীর্ঘদিন ধরে রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি প্রায় দুই বছর ধরে চলছে।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে সাধারণত ‘চলতি দায়িত্ব’ ও ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ প্রচলিত থাকলেও কৃষি খাতে নতুন করে ‘রুটিন দায়িত্ব’ শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। তবে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসে (বিএসআর) ‘রুটিন দায়িত্ব’ নামে কোনো স্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো বা সংজ্ঞা নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও পেশাগত মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) গত ৩ মে ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হলেও দুদিনের মাথায় সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) আফসারী খানমকে প্রথমে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা, পরে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় দুই মাসে তিনি মাত্র চার দিন ব্রিতে গেছেন। পরে ১৫ জুলাই কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. রফিকুল ইসলাম মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) পদে যোগ দেন। এর আগে তিনি পরিচালক (গবেষণা) হিসেবেও রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। ব্রির পরিচালক (প্রশাসন) পদও বর্তমানে রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে।

বারিতে প্রায় দুই মাস মহাপরিচালক পদ শূন্য থাকার পর গত ২৪ জুন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মঞ্জুরুল কাদিরকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আরও পাঁচ কর্মকর্তাকে পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের কৃষি গবেষণার সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান বিএআরসিতেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত নির্বাহী চেয়ারম্যান নেই। গত ৩০ অক্টোবর ড. মো. আবদুছ ছালামকে নির্বাহী চেয়ারম্যানের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখনও তিনি স্থায়ীভাবে দায়িত্ব পাননি। একই সঙ্গে তাঁকে আগের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সদস্য পরিচালকের পদও রুটিন দায়িত্বে চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেও (ডিএই) একই অবস্থা। সংস্থাটির সর্বশেষ তিন মহাপরিচালক রুটিন দায়িত্ব পালন করেই অবসরে গেছেন। বর্তমান মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম গত ৭ জানুয়ারি রুটিন দায়িত্বে যোগ দিলেও এখনও চলতি দায়িত্ব পাননি। ফলে তাঁকে মহাপরিচালকের পাশাপাশি উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এতে ওই পদে নতুন পদায়নও আটকে আছে।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিজেআরআই) ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ড. নার্গিস আক্তার মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। বিনায় মহাপরিচালকসহ দুটি পরিচালক পদ এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী পরিচালক পদটিও দীর্ঘদিন ধরে রুটিন দায়িত্বে চলছে।

নেতৃত্ব সংকটের পাশাপাশি পদোন্নতি ব্যবস্থাও স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় মাস আগে অতিরিক্ত পরিচালক পদে ২৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও এখনও 
তাদের পদায়ন হয়নি। একই সঙ্গে ২৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এতে মাঠ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে যারা রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন, তারা আর্থিক ও প্রশাসনিক পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করছেন এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। ফলে ‘রুটিন দায়িত্ব’ শব্দটি তাদের প্রকৃত দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তারা কার্যত মহাপরিচালকের সব দায়িত্ব পালন করলেও তাদের ‘রুটিন দায়িত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি শুধু ভাষাগত বিষয় নয়, বরং পদমর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতির প্রশ্ন।
আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সংস্থাপ্রধান রুটিন দায়িত্বে থাকায় তাঁকে আগের পদও ধরে রাখতে হচ্ছে। ফলে ওই পদে নতুন কর্মকর্তা পদায়ন করা যাচ্ছে না। এতে সংশ্লিষ্ট উইংয়ের কাজের গতি কমে যাচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত নিতেও দেরি হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক আহমেদ আলী চৌধুরী ইকবাল বলেন, কৃষি খাতে শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়, নীতিগত বৈষম্যও প্রকট। গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, বীজ উৎপাদন, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম), সমন্বিত ফসল ব্যবস্থাপনা (আইসিএম) এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। স্থায়ী নিয়োগ ও পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং অনেক যোগ্য কৃষিবিদ বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত স্থায়ী নেতৃত্ব নিয়োগ এবং প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।

বিএআরসির সাবেক চেয়ারম্যান ও কৃষিবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেস কবীর বলেন, দেশের প্রায় সব কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার পরও রুটিন দায়িত্বে রয়েছেন। এরই মধ্যে কয়েকজন এই রুটিন দায়িত্ব পালন করেই অবসরে গেছেন। এটি কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি বিধিবিধানে ‘রুটিন দায়িত্ব’ নামে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। কোনো কর্মকর্তা যদি পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তাহলে তাঁকে ‘চলতি দায়িত্ব’ দেওয়া অধিকতর যৌক্তিক। তাদের মতে, বর্তমান পদ্ধতি কর্মকর্তাদের মনোবল কমাচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রুটিন দায়িত্বের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে হয়েছে। কোথাও মহাপরিচালক হওয়ার জন্য দুই বছর, কোথাও তিন বছর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শর্ত রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ এবং সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) অনুমোদন পাওয়ার পর স্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হবে।
কৃষি সচিব বলেন, ২৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের পদোন্নতির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পাওয়ার পর যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে। অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়া ২৬ কর্মকর্তার পদায়ন নিয়েও সরকার অচিরেই সিদ্ধান্ত নেবে। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একবার পদোন্নতি কার্যকর হলে তা প্রত্যাহার করা কঠিন। তাই যারা বঞ্চিত হয়েছেন, শূন্য পদ সৃষ্টি হলে তাদেরও পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×