কাজে আসছে না কয়েক কোটি টাকার রেসকিউ বোট, চুরি যাচ্ছে যন্ত্রপাতি
শেরপুর সদর উপজেলার কামারের চর ইউনিয়নের ভাটিপাড়ায় ডুবে আছে একটি রেসকিউ বোট, অন্যটি পারে বাঁধা। গত রোববার তোলা ছবি সমকাল
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নদ-নদী ঘেরা শেরপুর জেলা। প্রতিবছরই বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। বিপাকে পড়েন লোকজন। প্রকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা ও নৌপথে জরুরি পরিস্থিতিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা জোরদারের লক্ষ্যে আধুনিক সুবিধাসংবলিত দুটি ‘রেসকিউ বোট’ দেয় সরকার। কিন্তু জনবল না থাকায় উদ্ধারকারী নৌযান দুটি নদীপারে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি।
শেরপুর সদর ঘিরে রেখেছে ব্রহ্মপুত্র, দশআনী ও মৃগী নদী। শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী উপজেলায় রয়েছে সোমেশ্বরী, মহারশি, মালিঝি, পাগলা ও ঢেউফা নদী। প্রতিবছর বর্ষায় এসব নদ-নদী খরস্রোতা হয়ে ওঠে। উজানের ঢলে প্লাবিত হয় লোকালয়, মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি হয়। একই রকম অবস্থা হয় নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলায়। পাহাড়ি ঢলে ভোগাই, চেল্লাখালি নদীর পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। পানিবন্দি হয়ে পড়েন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা। বানভাসি লোকজনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া ও ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল কয়েক কোটি টাকার দুটি রেসকিউ বোট (উদ্ধারকারী নৌযান) দেয় সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া নৌযান দুটি আধুনিক সুবিধাসংবলিত। পাহাড়ি জনপদ ঝিনাইগাতী উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র গজনীর নাম অনুসারে নৌযান দুটির নামকরণ করা হয় গজনী-১ ও গজনী-২। উদ্ধারকারী নৌযান দুটি বর্ষকালে পানিতে ভেসে থাকে। শুকনো মৌসুমে নদীর পারে বাঁধা থাকে। ৫৪ ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ১২ দশমিক ৫০ ফুট প্রস্থের একেকটি নৌযান ৮০ জন লোক ধারণ করতে পারে। একেকটি নৌযান সাত নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারে।
শেরপুর জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে– প্রকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা ও নৌপথে জরুরি পরিস্থিতিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা জোরদারের লক্ষ্যে ‘নৌযান সংগ্রহ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আওতায় উন্নত প্রযুক্তির উদ্ধারকারী নৌযান সংগ্রহ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই প্রকল্পের আওতায় শুধু শেরপুর নয়, বন্যায় অধিক ঝুঁকিতে থাকা ২১টি জেলায় রেসকিউ বোট দেওয়া হয়।
সদর উপজেলার কামারের চর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমানের ভাষ্য, ২ নম্বর ওয়ার্ডে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও দশআনী নদীর মোহনায় ৬ নম্বর চর ভাটিপাড়া আমতলা এলাকায় ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল গজনী-১ ও গজনী-২ নামে দুটি ‘রেসকিউ বোট’ আনা হয়। সে সময় নৌযান দুটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে মাস্টাররোলে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের পাঁচ মাস বেতন-ভাতাও দেওয়া হয়। কিছু দিন এদিক-সেদিক চলাচল করে উদ্ধারকারী নৌযানগুলো। হঠাৎ এক দিন সেগুলো ফেলে রেখে চলে যান চালকসহ প্রকল্পের লোকজন। তখন
থেকেই নৌযান দুটি নদীপারে অযত্নে ও অবহেলায় পড়ে আছে।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সাইদুর রহমান ও সমেস সাংমা জানান, তারা দেড় বছর কাজ করেছেন। কিন্তু পাঁচ মাসের বেতন পেয়েছেন। দেই দিচ্ছি করে কর্তৃপক্ষ তাদের ১৩ মাসের বেতন দেননি। এই কারণে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
ভাটিপাড়া মসজিদের ইমাম মাওলানা সিব্বির আহমেদ ওসমানী বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে কোটি টাকার নৌযান নষ্ট হচ্ছে, কোনো
কাজেই লাগল না। এখন একটি পানির নিচে ডুবে আছে। আরেকটি নদীপারে নষ্ট হচ্ছে। চুরি হয়ে গেছে অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি। যদি দ্রত রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলে সবকিছুই চুরি হয়ে যাবে। তাঁর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে নষ্ট হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
কামারের চর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু সাইদ আরজু বলেন, ‘ইতোপূর্বে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানিয়েছি। তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।’ তিনি জানান, উদ্ধারকারী নৌযানে ছিদ্র হয়ে গেছে। কিছু যন্ত্রপাতি চুরি হয়েছে। দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ না করলে অকেজো হয়ে যাবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক জানান, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখানে কোনো জনবল নেই, তহবিল নেই, তাই কিছু করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশের ২১ জেলার একই অবস্থা।
- বিষয় :
- চুরি