দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট
শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চাহিদার মাত্র ৫৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্পাঞ্চলে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শতাধিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বিনিয়োগও পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।
শিল্প মালিকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন নয়; রপ্তানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক শিল্পায়নের গতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিপর্যস্ত বস্ত্র-পোশাক খাত
শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্যাসনির্ভর বস্ত্র ও ডায়িং শিল্পে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্র জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সরবরাহ সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ছিল। স্বাভাবিকভাবে ১০ পিএসআইজি চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ কারখানায় তা নেমে আসে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআইজিতে। কোনো কোনো কারখানায় চাপ শূন্য দশমিক ৫ পিএসআইজিও রেকর্ড করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ভূলতায় লিটল গ্রুপের ইন্টিমেট স্পিনিং মিলস এবং সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলসে দিনভর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান এম খোরশেদ আলম বলেন, ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে সোলার, ব্যাটারি ও বিদ্যুতের সমন্বয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় সেটিও কার্যকর হচ্ছে না।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে গত দুই দিনে গ্যাস সংকট চরমে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়িং কারখানা বন্ধ ছিল। সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার যে বিকল্প ব্যবস্থা ছিল, সেটিও এখন অচল। ফলে ডায়িং, ফিনিশিং ও আয়রনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত, বাতিল বা মূল্য কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটসহ নানা আনুষঙ্গিক কারণে বর্তমানে দেশের অন্তত ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
গাজীপুর
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের অনেক এলাকায় গতকাল গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।
কোনাবাড়ীর তুসুকা গ্রুপের পরিচালক তারেক হাসান জানান, তাদের কারখানা চালাতে ১৫ পিএসআই গ্যাস প্রয়োজন হলেও গতকাল সকাল থেকে চাপ ছিল শূন্য। উৎপাদন সচল রাখতে পাঁচটি ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। ১১ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ধরে রাখলেও এভাবে দীর্ঘদিন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
মৌচাকের সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডের পরিচালক সোহেল রানা বলেন, প্রয়োজনীয় ৪ পিএসআইয়ের বিপরীতে তারা পাচ্ছেন মাত্র ১ পিএসআই। বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালাতে প্রতিদিন চার লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, তবুও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুরের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম. এম. মামুন-অর-রশিদ বলেন, জেলা ও মহানগরের তিন হাজারের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছে।
ভালুকা
ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটছে। জামিরদিয়ার নোমান কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল লিমিটেডের সিনিয়র জিএম রেদোয়ান আহাম্মেদ জানিয়েছেন, দিনে কয়েকবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বারবার মেশিন থেমে যাচ্ছে। এতে জেনারেটর ও যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ডিবিএল গ্রুপের গ্লোরি টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রির জিএম আনোয়ার হোসেন বলেন, এখনও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে মাঝেমধ্যেই গ্যাস না থাকায় উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে।
শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জিএম মোকলেসুর রহমানের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় এমনিতেই বেড়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জে গত কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ডাইং ও নিটিং শিল্প। বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজুল হক জানান, তাদের কারখানায় ১৬-১৮ পিএসআই গ্যাস প্রয়োজন হলেও এখন মিলছে মাত্র ৪-৫ পিএসআই। ফলে গ্যাসচালিত জেনারেটর সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং ডিপিডিসির বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে যাওয়ায় ডাইং করা কাপড়ের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রহমান নিট গার্মেন্টসের পরিচালক শিহাব উদ্দিন বলেন, ডাইং সেকশনের অধিকাংশ শ্রমিক কয়েক দিন ধরে কার্যত বসে আছেন।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম বলেন, গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের বাড়তি দাম এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের চাপ– সব মিলিয়ে পোশাকশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে রি-রোলিং মিল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রশিদ জুয়েল জানান, পর্যাপ্ত কাজের অর্ডার থাকলেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
সাভার-আশুলিয়া
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ ওঠানামা করছে। গতকাল সকালে গ্যাস থাকলেও দুপুরে ছিল না, রাতে সামান্য সরবরাহ মিলছে।
শিল্পোদ্যোক্তা আবুল কাশেম বলেন, উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানায় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানো হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
আল-মুসলিম গ্রুপের কর্মকর্তা রাজু আহম্মেদ বলেন, কাজের সংকটের মধ্যেই গ্যাস সমস্যা নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। সময়মতো রপ্তানি করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে।
লুসাকা গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মনিরুজ্জামান বলেন, সারাদিনই গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে এলপিজি ও ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের সেই চাপ বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
সার কারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার শিল্পেও। চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (সিইউএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় গত ৪ মার্চ থেকে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও কবে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে– সে বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে কাফকোতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে এবং সেখানে উৎপাদন চলছে। ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
সংকটে বিনিয়োগ
চলমান জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা। সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নতুন বিনিয়োগ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি আর্থিক খাতেও বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
গত বুধবার এক সেমিনারে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান জানান, জ্বালানির নিশ্চয়তা ছাড়া দেশে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক বা নতুন বিনিয়োগকারীরা যে কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেখানকার বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলো কী পরিস্থিতিতে পরিচালিত হচ্ছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ফলে বর্তমানের এই সংকট নতুন যে কোনো বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে।
শিল্প খাতের এই স্থবিরতা দেশের ব্যাংকিং খাতকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে একই সেমিনারে সতর্ক করেছেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী। তিনি জানান, শুধু পর্যাপ্ত গ্যাস সংযোগ না থাকায় তাদের ব্যাংকেরই প্রায় সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে আছে। গ্যাস সংযোগের অভাবে বহু উদ্যোক্তার বিদেশ থেকে আমদানি করা কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অলস পড়ে আছে। এসব শিল্প প্রকল্পগুলো চালু হতে না পেরে শেষ পর্যন্ত খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে সার্বিক ব্যাংকিং খাতেও বিশাল আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে।
[ প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা]
- বিষয় :
- শিল্পকারখানা
- গ্যাস
- সংকট