বিশ্লেষণ
পদে থাকাকালীন দায়মুক্তি পান রাষ্ট্রপতি, আগে পরে নয়
মো. সাহাবুদ্দিন
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৩ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ২৩:০৬
সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করছে এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, ‘কীসের বিচার করবে! সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক’। এতে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি রয়েছে।
তবে সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে এই অনুচ্ছেদে যে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা শুধুই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা কাজের। পদে থাকা অবস্থায় কোনো আইন লঙ্ঘন করলে দায়মুক্তি নেই। যদিও রাষ্ট্রপতি যতদিন দায়িত্বে থাকেন, ততদিন তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। কোনো আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারও করা যায় না।
তবে চুপ্পু নামে অধিক পরিচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বঙ্গভবনে আসার আগে অর্থপাচারের মাধ্যমে আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় সম্পদ কেনা, স্থায়ী বসাবসের সুবিধা নেওয়াসহ নানা অভিযোগ তথ্য প্রমাণসহ প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।
বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের ‘জেএমসি বিল্ডার্সে’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাহাবুদ্দিন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এস আলম নিয়ন্ত্রিত ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন সাহাবুদ্দিন। এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেরও উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
জিএম বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ এবং শেয়ার জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালনের সময় ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ ঋণের নামে জালিয়াতি করে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে বিদেশে পাচার করেছে বলে বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগের এসব ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়া সাহাবুদ্দিনের বিচারে আইনি বাধা নেই।
সংবিধানে কী বলা হয়েছে
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অলংকারিক পদ। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কোনো একক ক্ষমতা নেই। তবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায়, রাষ্ট্রপতি একমাত্র ক্ষমতা হচ্ছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
বাহাত্তরের সংবিধান সময়েও এই বিধান ছিল। যদিও তখনও এখনকার মতই সংবিধানের ৫৫(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘সরকারের সব নির্বাহী ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত হয়েছে বলে প্রকাশ করা হবে।’ অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা নির্বাহী ক্ষমতায় দেশ পরিচালনা করলেও, সব কাজ করা হয় রাষ্ট্রপতি নামে। যেমন কারা মন্ত্রী হবেন বা কে মন্ত্রী পদে থাকবেন, তা ঠিক করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছে বা রাষ্ট্রপতি বরখাস্ত করেছেন। একইভাবে কোনো দপ্তরে একজন পিয়ন নিয়োগ করা হলেও কাগজেপত্রে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়েছেন। প্রজ্ঞাপন, পরিপত্রসহ সরকারের সব নির্দেশে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির আদেশে তা জারি করা হয়েছে।যদিও কাজগুলো করে নির্বাহী বিভাগ। ফলে পদে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই- যার জন্য তিনি পরবর্তীতে দায়ী হতে পারেন। অন্যান্য দেশের মত সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে দায়িত্বকালীন সময় এবং কাজের জন্য।
৫১(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিংবা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো করলে বা না করলে এজন্য তাঁহাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। ৫১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলা দায় বা চালু রাখা যাবে না। তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠাতে কোনো আদালত পরোয়ানা জারি করতে পারবেন না।’
তবে ৫২ অনুচ্ছেদে সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের বিধান রয়েছে। তা সংসদে প্রমাণ হলে দুই তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যায়।
সাবেক ২ রাষ্ট্রপতির সাজা
অতীতে যে দুই রাষ্ট্রপতি দণ্ডিত হয়েছিলেন, তারা আলংকারিক নন, নির্বাহী ক্ষমতার অধিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁদের সময়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু ছিল বাংলাদেশে।
নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পদত্যাগ করা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার পর ৪৩ মামলার আসামি হয়েছিলেন। জনতা টাওয়ারের জমি বরাদ্দে ক্ষমতার অপব্যবহার মামলায় জেল খাটেন। সাজা হয়েছিল ক্ষমতায় থাকার পর উপহার পাওয়া অস্ত্র অবৈধভাবে রাখায়।
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রীয় উপহার কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের মামলায় এরশাদের তিন বছর কারাদণ্ড হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। হাইকোর্টেও এই সাজা বহাল থাকে। বাকি সব মামলায় তিনি খালাস পেলেও আমৃত্যু মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামি ছিলেন এরশাদ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ। একই বছরের ৩ নভেম্বর আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
১৯৭৬ সালে সামরিক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় খন্দকার মোশতাককে। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দুটি পৃথক মামলায় ১৯৭৭ সালে বিশেষ সামরিক আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করে। ১৯৭৯ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহারের পর তিনি মুক্তি পান।
বঙ্গভবনের আগে পরে দায়মুক্তি নেই
রাষ্ট্রপতি দায়িত্বগ্রহণের পর বঙ্গভবনে উঠেন। পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষে চলে যান। শুধু এই সময়টুকুতে সরকারি কাজের জন্য দায়মুক্তি ভোগ করেন। এনসিপিসহ কয়েকটি দল সাবেক রাষ্ট্রপতিকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে বিচার দাবি করছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ের ভূমিকার জন্যও তার বিচার দাবি করেছে।
তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালে ২১ জুলাই শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিল স্মারকলিপি নিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়েও জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার প্রাণ রক্ষায় কিছুই করেননি। ১৬ জুলাই ৫ আগস্ট পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেননি। দেখামাত্র গুলির করার কারফিউ রাষ্ট্রপতির নামে জারি হলেও, সাংবিধানিকভাবে এসব কাজের দায়ভার রাষ্ট্রপ্রধানের নয়।
তবে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ এস আলম সংশ্লিষ্টতা। বিএফআইইউ তদন্ত অনুযায়ী, ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করা এস আলম গ্রুপ সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণের নামে নিয়ে পরিশোধ করেনি। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত নেই। ভুয়া কোম্পানিগুলো ব্যাংকের শেয়ার কেনা হয়েছে, ব্যাংকের টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে। ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংকে ছিলেন সাহাবুদ্দিন। তাঁকে এস আলমের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে বিচার দাবি করছে বিরোধীরা।
২০২৫ সালের শেষভাগে হাইকোর্টের নির্দেশে বিএফআইইউ ৪২ পৃষ্ঠার যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে জেএমসি বিল্ডার্স এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। তিনি দুদকের কমিশনার পদে থাকা অবস্থায় অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা।
যদিও জামায়াত, এনসিপি যেভাবে সাহাবুদ্দিনের প্রতি ক্ষোভ দেখাচ্ছে, ততটা কঠোর নয় বিএনপি। মেয়াদ পূরণের আগে সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ছেড়েছেন অসুস্থতার কারণে। বিএনপি এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছুই বলছে না। তবে ৫ পর জামায়াত, এনসিপি যখন রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি তুলেছিল, তখন সাংবিধানিক শূন্যতার আশঙ্কা দেখিয়ে বিএনপি এর বিরোধিতা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন থেকে খুব একটা বের হতে না পারলেও, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতেও যোগ দেন।
সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে এস আলম সংশ্লিষ্টতায় বিচার চালানো হবে কিনা- তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শুক্রবার বলেছেন, ৫ আগস্টের পর মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন রাষ্ট্রপতি।
- বিষয় :
- মো. সাহাবুদ্দিন
- রাষ্ট্রপতি
- বাংলাদেশ