ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্যোগ

সবজির কোল্ডস্টোরেজ আমচাষিরও ভরসা

সবজির কোল্ডস্টোরেজ  আমচাষিরও ভরসা
×

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষকদের জন্য স্থাপিত মিনি কোল্ডস্টোরেজ -সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

২৫ দিন আগেও হাঁড়িভাঙা আমের ভরা মৌসুম ছিল। বাজারে সরবরাহ এত বেশি যে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হয় এক হাজার ৯০০ থেকে দুই হাজার টাকায়। ভরা মৌসুমে অন্যদের মতো তড়িঘড়ি করে আম বিক্রি করেননি কৃষি উদ্যোক্তা বুলু আজাদ। তিনি ১৫০ ক্যারেট আম নিয়ে যান এলাকার একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজে। মূলত সবজি সংরক্ষণের জন্য তৈরি ওই স্টোরেজটি। এর পরও সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে আম রাখেন বুলু আজাদ। প্রায় ২০ দিন পর বাজারে সরবরাহ কমে গেলে সেই সংরক্ষিত আম বিক্রি হয় প্রতি মণ ছয় হাজার টাকা দরে। ভরা মৌসুমের তুলনায় মণপ্রতি দাম বেড়ে যায় প্রায় চার হাজার টাকা। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত আয় হয় তিন লাখ টাকার বেশি।

বুলু আজাদের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কৃষকের লাভ বাড়াতে সব সময় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। কখন বিক্রি করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও অনেক সময় সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষকদের জন্য স্থাপিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ। 

জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন উৎপাদন এলাকায় ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি রুমভিত্তিক এবং ৫০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত কনটেইনারভিত্তিক। প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে আরও ৮০টি কনটেইনারভিত্তিক মিনি কোল্ড স্টোরেজ। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সবজির সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো এবং কৃষককে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, একই প্রযুক্তিতে আমও সংরক্ষণ করছেন কৃষক।

প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, কৃষক ফসল উৎপাদন করলেও সময়মতো বিক্রি করার স্বাধীনতা থাকে না। কারণ ফল ও সবজি দ্রুত নষ্ট হয়। তাই বাজারে দাম কম থাকলেও বিক্রি করতে হয়। মিনি কোল্ড স্টোরেজ কৃষককে কিছুদিন অপেক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ দিনের এই অপেক্ষাই বাজারদর বদলে দিতে যথেষ্ট। হাঁড়িভাঙা আম এর বাস্তব উদাহরণ। তিনি বলেন, এসব কোল্ড স্টোরেজ মূলত সবজি সংরক্ষণের জন্য তৈরি হলেও পণ্যের ধরন অনুযায়ী সঠিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিশ্চিত করা গেলে আমসহ বিভিন্ন ফলও সংরক্ষণ করা সম্ভব। কোল্ড স্টোরেজে কুলবট নিয়ন্ত্রিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সেন্সর, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা হয়। এতে ফল ও সবজির সতেজতা দীর্ঘ সময় থাকে। 
শুধু রংপুরেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব মিনি কোল্ড স্টোরেজে ইতিমধ্যে গাজর, টমেটো, মরিচ, বিটরুট, ক্যাপসিকাম, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, পেঁপে, শসা, বেগুন ও মিষ্টি আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরের উদ্যোক্তা বায়েজিদ গাজর সংরক্ষণ করেছেন ১০৭ দিন। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন গাজর ৭৭ দিন, বিটরুট ৯২ দিন, লাল পাতাকপি ৮৭ দিন এবং ক্যাপসিকাম ২৭ দিন পর্যন্ত রেখেছেন।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরের উদ্যোক্তা আতিক মাল্টা ৯৩ দিন, কমলা ৯১ দিন ও ড্রাগন ফল ৩৪ দিন সংরক্ষণ করেছেন। খুলনার বটিয়াঘাটার রহিম বিটরুট রেখেছেন ১২২ দিন এবং মিষ্টি আলু ৫৯ দিন। গাজীপুরের শাহিন মরিচ ৩৮ দিন ও টমেটো ২৮ দিন এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী কাঁচা টমেটো ২৯ দিন ও কাঁচা মরিচ ২৮ দিন সংরক্ষণ করেছেন।
সিংগাইরের মেদুলিয়ায় সৌরবিদ্যুৎচালিত একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ ঘিরে ২০ কৃষকের একটি সংগঠন তৈরি হয়েছে। কৃষকরা আলাদাভাবে জমিতে চাষ করলেও ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ একসঙ্গে করছেন। 
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সারাদেশে দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ইউনিট ১৫ থেকে ২০ জন কৃষকের সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।

আরও পড়ুন

×