হামের চিকিৎসায় ঋণগ্রস্ত ৮৯% পরিবার, সঞ্চয় শেষ ৬১%
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামের প্রাদুর্ভাব শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়; নিম্ন আয়ের হাজারো পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ও ডেকে এনেছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, খাবার ও হাসপাতালে অবস্থানের আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে আক্রান্ত পরিবারের ৮৯ শতাংশকেই ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসা চালাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করেছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জরিপে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ভেঙেছে। ৪ শতাংশ পরিবার সম্পদ বিক্রি করেছে এবং ৩ শতাংশ পরিবার দান বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে।
হামের আর্থিক অভিঘাত শুধু চিকিৎসা খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক অভিভাবক অসুস্থ সন্তানের পাশে হাসপাতালে থাকতে গিয়ে নিয়মিত কাজে যেতে পারেননি। ফলে দৈনিক মজুরি হারিয়েছেন, মাসিক আয় বন্ধ হয়েছে। কেউ কেউ দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে চাকরিও হারিয়েছেন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
জরিপ অনুযায়ী, একজন হামে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে গড়ে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার ৬১১ টাকা, যা প্রায় ১৬ হাজার টাকার সমান। কোনো কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের মধ্যে ৭৮ শতাংশের প্রধান উপার্জনকারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। পারিবারিক আয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, ৩২ শতাংশের আয় ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, ১৬ শতাংশের আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ১২ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ৬ হাজার টাকার কম।
আক্রান্তদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের কম। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোগী মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে অল্পবয়সী শিশুরা, যাদের দীর্ঘ সময় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।
ভৌগোলিকভাবে জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের ৩২ শতাংশ ঢাকার, ২২ শতাংশ চট্টগ্রামের, ২০ শতাংশ বরিশালের, ১৮ শতাংশ ময়মনসিংহের। রাজশাহী ও রংপুরের ৩ শতাংশ করে, খুলনার ২ শতাংশ এবং সিলেটের ১ শতাংশ পরিবার এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সব পরিবারই কোনো না কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ৩৩ শতাংশ পরিবার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা, ২২ শতাংশ খাদ্য, ১১ শতাংশ যাতায়াত ব্যয়, ৩ শতাংশ বাড়ি ভাড়া এবং ২ শতাংশ যোগাযোগ ব্যয়ের সহায়তা চেয়েছে। তবে মূল্যায়নে অংশ নেওয়া সব পরিবারই অর্থ সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
জরিপটি মূলত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে জরুরি সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। মূল্যায়নের ভিত্তিতে ২ হাজার ৭৪৬ পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২ হাজার ৪০০ পরিবারকে নির্বাচন করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
রংপুরের হাজেরা খাতুন সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। গত জুনে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসেন। এ পর্যন্ত পরিবারের খরচ হয়েছে ৭০ হাজার টাকার বেশি। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে। তাঁর স্বামী সৌদি আরবে কাজ করলেও ওই মাসে বেতন না পাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম আশরাফ আলম বলেন, মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই নয়; বড় ধরনের আর্থিক সংকটেও পড়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তার পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব হাসপাতালের দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের পরিচর্যা করতে গিয়ে বহু পরিবার আয় হারাচ্ছে এবং আর্থিক সংকটে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিম্ন আয়ের আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয় কমানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় চিকিৎসার খরচ বহু পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
- বিষয় :
- হাম
- জনস্বাস্থ্য
- চিকিৎসা