তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে আরও ৫ কোটি মানুষ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ নতুন করে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। গতকাল বুধবার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় তারা।
প্রতিবেদনটির বরাতে জানা গেছে, আগে থেকেই ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে ২২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। নতুন বাস্তবতায় সেটির বাইরে আরও প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষের এ রকম ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে উঠে এসেছে ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনের বিষয়টি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাভাসের তুলনায় এল নিনোর প্রভাব কিছুটা কম হতে পারে। তবুও এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে, যা কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ডব্লিউএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি লাখো কৃষকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্টি হওয়া এল নিনো বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন বদলে দেয়। এর ফলে কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও তাপপ্রবাহের তীব্রতা বেড়ে যায়। চলমান এল নিনো অন্তত গত ৭০ বছরের অন্যতম শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও কেউ কেউ একে ‘সুপার এল নিনো’ বলছেন, এটি আনুষ্ঠানিক কোনো বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নয়।
ডব্লিউএফপি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠছে। শক্তিশালী এল নিনো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যৌথ প্রভাবে চলতি বছর অথবা ২০২৭ সালে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর দেখা যেতে পারে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন জলবায়ুবিজ্ঞানীরা।
খাদ্যবাজার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠান আগেই এল নিনোর কারণে বৈশ্বিক খাদ্যদাম বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। তবে ডব্লিউএফপির এই প্রতিবেদনই প্রথম, যেখানে বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম আগেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও প্রস্তুতিমূলক ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে ডব্লিউএফপি। এ জন্য অন্তত আট কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হবে না। কৃষকদের খাদ্য মজুত ফুরিয়ে যেতে এবং উৎপাদন ঘাটতির পুরো প্রভাব দৃশ্যমান হতে একাধিক মৌসুম লেগে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রধান কৃষি মৌসুম চলবে এ বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। তবে ফসল কাটার প্রায় ৯ মাস পর শুরু হওয়া দুর্ভিক্ষপ্রবণ মৌসুমে খাদ্য সংকট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
ডব্লিউএফপির জলবায়ু ও সহনশীলতা বিভাগের পরিচালক রিচার্ড চুলারটন বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা দিতে পারে ২০২৭-২৮ সালের খাদ্য সংকট মৌসুমে। অন্যদিকে, ডব্লিউএফপির খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ-মার্টিন বাওয়ার বলেন, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক খাদ্যপণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, শুধু প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ৪৫টি দেশ নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে এর মাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় বিশ্বে প্রায় ৬ থেকে ১০ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছিলেন। সেই সময় ডব্লিউএফপির আগাম প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি এত বিস্তৃত ছিল না। এবার আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির কারণে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। তবে রিচার্ড চুলারটন বলেন, অর্থ সংকটের কারণে বিভিন্ন দেশে তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। ডব্লিউএফপির তথ্যভান্ডারে মাত্র ৪৫টি দেশ অন্তর্ভুক্ত থাকায় এর বাইরে আরও অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কৃষকরা ইতোমধ্যে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতারা সম্ভাব্য খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
- বিষয় :
- খাদ্য সংকট