অভিমত
শিক্ষার্থীরাই কি শুধু দায়ী?
ছাত্রছাত্রীরা কেন ফেল করল, তা নিয়ে কি কোনো গবেষণা হয়েছে?
গওহার নঈম ওয়ারা
গওহার নঈম ওয়ারা
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল দেখল দেশ। এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ফেল করেছে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী।
কেন এ বিপর্যয়– তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা নানা রকম বিশ্লেষণ করছেন। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে বেশি ফেল করায় এমন ফল বিপর্যয়।
সকাল থেকে ব্যস্ত ছিলাম শরীয়তপুরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক আর অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে। শিক্ষার মান যে নেমে যাচ্ছে– তাতে কারও কোনো সন্দেহ নেই। এর মধ্যেই খবর এলো, অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও এই জনপদে বাল্যবিবাহ সহজ ছিল না। থানা-পুলিশ হতো। শিক্ষার্থীরাই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে ছুটে যেত সরকারি দপ্তরে। ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকরা ছুটে আসতেন।
অভিযুক্তদের ‘দৌড়ানির’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত সামাজিক মাধ্যমে। তা দেখে অন্যরা সাবধান হতেন। এখন আর সেই দম নেই। মনে হচ্ছে, সবাই বিষয়টি ক্রমশ মেনে নিচ্ছে। এসব নিয়ে যখন ‘আবার জাগতে হবে’ মার্কা ভাষণ চলছিল, তখন রাজশাহীর বাগমারা থেকে তহিদুলের ফোন এলো। উপজেলার ১১ নম্বর গনিপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী কারিনা আত্মহত্যা করেছে। কারিনা স্থানীয় চাঁন্দেরআড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। সহকারী শিক্ষক আ. আউয়াল তহিদুলকে জানান, কারিনা ছাত্রী হিসেবে ভালো ছিল। কী কারণে তার ফল খারাপ হয়েছে, বলা কঠিন।
ফল খারাপ হতেই পারে। তাই বলে জীবন শেষ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। সে চাইলে পরে আবারও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত। এসব কথার এখন আর কোনো মানে নেই। ভেবেছিলাম, আর কোনো ফোন ধরব না। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের হামিদুল ফোন করেই চলেছে। চাঁপাইয়ের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের পুরাতন উনিশবিঘী গ্রামের মেয়ে তরিকা চাকপাড়া আদর্শ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। অকৃতকার্য হওয়ায় বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। এর পর আমি ফোন বন্ধ করে ফেলি। ফল ঘোষণার দুই ঘণ্টা পার না হতে একের পর এক এমন খবর আর নিতে পারছিলাম না। এবার ছাত্রীদের গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে এগিয়ে ছাত্রীরা।
কেন এমন হচ্ছে, দায় কার?
পাবলিক পরীক্ষায় সাফল্য পেতে ব্যর্থ হয়ে শিক্ষার্থীদের এই আত্মহত্যার ট্র্যাজেডির দায় কার? শিক্ষার্থীরাই কি শুধু দায়ী? সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা কি এর দায় এড়াতে পারে? পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সাফল্য পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যত হই-হুল্লোড় করা হচ্ছে; খারাপ ফল করা ছাত্রছাত্রীরা কেন ফেল করল, তা নিয়ে কি কোনো গবেষণা হয়েছে?
১১টি বোর্ডের ফলে সবার ওপরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং তলানিতে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। তবে শুধু সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের হিসাব কষলে ফল বিচারে সবার নিচে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। কারিকুলামে যেভাবে শেখানোর কথা, সেভাবে শেখালে কেউ ফেল করার কথা নয়। প্রথমত, কারিকুলাম নামমাত্র মানে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তারা মানসম্মত উপায়ে ক্লাসে পড়াতে পারেন না। আর সবশেষ যেটা সমস্যা তা হলো, শিক্ষকরা বেতন-ভাতা কম পাওয়ায় নিজ পেশায় মনোযোগ কম দেন। এতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও তারা অবহেলা করেন। এসব কথা বলেছেন শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
অভিভাবকের প্রত্যাশা ও মানসিক বোঝা
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের জীবনে অভিভাবকের প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সন্তান যেন ভালো ফল করে– এটা প্রত্যেক মা-বাবার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি পরিণত হয় অন্ধ প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়ার চাপ, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে জন্ম নেয় ভয়, ব্যর্থতার আতঙ্ক। ‘যদি ফেল করি, মা-বাবাকে কী করে মুখ দেখাব’– এই প্রশ্ন অনেক সময় তাদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। শুধু সন্তানের ভালো ফলই নয়; পরিবারের উচিত তার মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির বিষয়েও সমান মনোযোগ দেওয়া।
ইরানে কী হয়
একসময় ইরানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ভাবিয়ে তুলেছিল। সেখানে এখন প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলাদা একটা বিভাগ থাকে। তাদের কাজ হচ্ছে, হঠাৎ কোনো শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হলে তাদের কাউন্সেলিং করা। প্রতি টার্মে যাদের ফল এমন হয়, তাদের নাম একাডেমিক ভবন থেকে এই বিভাগে পাঠিয়ে দিলে তারা শিক্ষার্থীদের দেখা করতে বলে। সেখানে মূলত শিক্ষার্থী তার ফল কেন খারাপ হচ্ছে– জানালে সেভাবে তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীর সারাদিন কীভাবে কাটে; মানসিক সমস্যা থাকলে সে বিষয়ে কী করা যেতে পারে; পারিবারিক কোনো সমস্যা থাকলে সে বিষয়ে জানানো; গড় মার্ক বাড়াতে কীভাবে রুটিন করে পড়াশোনা করা যেতে পারে– ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এভাবে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ পরপর ক্লাসগুলোতে অংশ নিয়ে আপডেট জেনে আবারও নতুন পরামর্শ দেওয়া হয়। আমরা হয়তো ইরানের মতো এখনই কিছু করতে পারব না, তবে শিক্ষকদের নিয়েই একটা চেষ্টা করতে পারি।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষার ফলকে জীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে না দেখা এবং ফল খারাপ হলে দ্রুত মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ১৫টি কার্যকর করণীয়
১। ফলাফল ≠ জীবন– ফেল করা বা কম নম্বর পাওয়া মানে জীবনের শেষ নয়। আবার পরীক্ষা দেওয়া ও পথ পরিবর্তনের সুযোগ তো আছে।
২। ফল প্রকাশের আগে অভিভাবকদের প্রতিশ্রুতি– ‘ফল যা-ই হোক, তোমাকে বকা, মারধর বা অপমান করব না।’
৩। তুলনা বন্ধ করুন– ‘ও ৯০ পেয়েছে, তুমি কেন পারনি’– এ ধরনের কথা এড়িয়ে চলুন।
৪। ফল জানার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ– সন্তান খারাপ ফল করলে প্রথমে বলুন, ‘তুমি ঠিক আছ তো? আমরা তোমার পাশে আছি।’
৫। একাকী থাকতে দেবেন না– বিশেষ করে ফল প্রকাশের দিন ও পরবর্তী কয়েক দিন উদ্বেগ বা হতাশায় থাকা শিক্ষার্থীর পাশে থাকুন।
৬। আত্মহত্যার কথা বললে গুরুত্ব দিন– ‘এগুলো বলছ কেন?’ এভাবে বলে ধমক না দিয়ে শান্তভাবে তার কথা শুনুন।
৭। সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায়– ‘তোমার কি নিজেকে শেষ করে ফেলার কথা মনে হচ্ছে?’ সরাসরি জিজ্ঞেস করলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে– এমন ধারণার পক্ষে ভালো প্রমাণ নেই।
৮। ঝুঁকির লক্ষণ খেয়াল করুন– হঠাৎ সবার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া; ‘আমি শেষ’; ‘আমার আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই’– এ ধরনের কথা, বিদায় নেওয়ার মতো আচরণ, নিজের ক্ষতি করার প্রস্তুতি ইত্যাদি।
৯। উচ্চ ঝুঁকিতে একা রাখবেন না– আত্মহত্যার পরিকল্পনা বা তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকলে পরিবারের একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক সার্বক্ষণিক পাশে থাকুন এবং দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিন।
১০। শিক্ষকের ভূমিকা– ফল খারাপ হওয়া শিক্ষার্থীকে অপমান বা প্রকাশ্যে আলাদা না করে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলুন।
১১। বিকল্প পথ দেখান– কারিগরি শিক্ষা, ডিপ্লোমা, আবারও পরীক্ষা, বিষয় পরিবর্তনসহ বিভিন্ন শিক্ষাগত পথ সম্পর্কে জানানো।
১২। সামাজিক মাধ্যমের চাপ কমান– ফল প্রকাশের দিন অন্যের জিপিএ উদযাপনের সঙ্গে নিজের ফলের তুলনা না করা।
১৩। ঘুম, খাবার ও স্বাভাবিক রুটিন বজায় রাখা– হতাশার সময়ে এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা উপাদান।
১৪। বন্ধুকে প্রশিক্ষিত করুন– ‘তুই একা নস, আমি আছি’– এই একটি কথাও বিপদে থাকা বন্ধুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১৫। একটি জাতীয় ‘ফল-পরবর্তী সেফটি প্ল্যান’ থাকা দরকার– স্কুল, পরিবার, শিক্ষা প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবাকে ফল প্রকাশের আগেই প্রস্তুত রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কথা অভিভাবকদের বলা উচিত
১. তোমার ফল তোমার মূল্য নির্ধারণ করে না।
২. তুমি ফেল করলেও তুমি আমাদের সন্তান– এটা বদলাবে না।
৩. তোমার সঙ্গে আমরা কাউকে তুলনা করব না।
৪. সমস্যা হলে একসঙ্গে সমাধান খুঁজব।
৫. তুমি খুব খারাপ বোধ করলে তৎক্ষণাৎ আমাদের সঙ্গে কথা বলবে।
লেখক: গবেষক
ই-মেইল: [email protected]
- বিষয় :
- অভিমত
- এসএসসি
- রেজাল্ট
- শিক্ষা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান