ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

মিল্ক ভিটা

ভোক্তার জন্য বাড়ল ১০ টাকা, খামারিরা পাচ্ছেন ৩ টাকা

উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে দুধ বিক্রির অভিযোগ খামারিদের

ভোক্তার জন্য বাড়ল ১০ টাকা, খামারিরা পাচ্ছেন ৩ টাকা
×

ফাইল ফটো

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৫ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

খামারিদের কাছ থেকে কম দামে দুধ কিনে ভোক্তাদের কাছে তুলনামূলক চড়া দামে বিক্রি করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড– মিল্ক ভিটা। প্রতিষ্ঠানটি গত ১ আগস্ট থেকে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনার দাম লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ তিন টাকা বাড়ালেও ভোক্তা পর্যায়ে এক লিটার দুধের দাম বাড়িয়েছে ১০ টাকা। এতে খামারিরা উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেলেও বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

মিল্ক ভিটার পাস্তুরিত তরল দুধের এক লিটারের প্যাকেট এখন খুচরা বাজারে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এর দাম ছিল ১০০ টাকা। অন্যদিকে ন্যূনতম ৪ শতাংশ চর্বিযুক্ত এক লিটার দুধের জন্য খামারিদের দেওয়া হচ্ছে ৫৩ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ টাকা। অর্থাৎ ৫৩ টাকায় দুধ কিনে প্যাকেটজাত করে ১১০ টাকায় বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে বাজারে প্রাণ, ফার্ম ফ্রেশসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তরল দুধের দাম এখনও বাড়েনি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে আধা লিটার আড়ং ও ফার্ম ফ্রেশ দুধ ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ফলে মিল্ক ভিটার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে খামারি ও ভোক্তা– দুই পক্ষের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

খামারিদের বক্তব্য, দুধ উৎপাদনের খরচই এখন লিটারপ্রতি ৫৫ টাকার বেশি। ফলে ৪ শতাংশ চর্বিযুক্ত দুধের জন্য ৫৩ টাকা দেওয়া হলেও তাদের লোকসান হচ্ছে। অন্যদিকে খোলাবাজার ও বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে একই দুধ ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন অনেক খামারি।

গবাদি পশুর খাদ্যের দাম বাড়ায় গত কয়েক বছরে দুধ উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খইল, ভুসি, মসুর, ফিড ও ওষুধের দাম বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে চারণভূমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার দক্ষিণ বাঙলাপাড়া দুগ্ধ সমবায় সমিতির সদস্য আব্দুল করিম সরদার বলেন, খইল-ভুসির দাম আগে কম ছিল। এখন বস্তাপ্রতি দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। দুধে পোষায় না। দুধের দাম ৬৫-৭০ টাকা হলে আমাদের পোষাত। 

মিল্ক ভিটার দুধের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তাঁর মতে, দুধ বাজারজাত করতে চিলিং, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয় ছাড়া বড় কোনো অতিরিক্ত খরচ থাকার কথা নয়। আবার দুধ থেকে বিভিন্ন উপজাতও তৈরি করে মিল্ক ভিটা। তিনি বলেন, গ্রামে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় দুধ পাওয়া যায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মিল্ক ভিটার মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকা উচিত।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মিল্ক ভিটা ক্রয়মূল্যের দ্বিগুণের কাছাকাছি দামে দুধ বিক্রি করছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক। মিল্ক ভিটার মূল উদ্দেশ্য মুনাফা করা নয়, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি বলেন, এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে মানুষ। সরকার চেষ্টা করছে কীভাবে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যায়। মিল্ক ভিটার উচিত ছিল সরকারের উদ্দেশ্য সফল করতে দাম কতটা কম রাখা যায়, সেটি বিবেচনা করা। সেখানে তারা মূল্যস্ফীতি উস্কে দেওয়ার কাজ করল। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মিল্ক ভিটার নতুন দামের দুধ বিক্রি হতে দেখা যায়। ৫০০ মিলিলিটারের স্ট্যান্ডার্ড দুধের দাম ৬০ টাকা, যা আগে ছিল ৫৫ টাকা। একই পরিমাণ টোন্ড মিল্কের দাম হয়েছে ৫৫ টাকা, আগে ছিল ৫০ টাকা। তবে প্রাণ, ফার্ম ফ্রেশসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তরল দুধের দাম বাড়েনি। বিক্রেতারা জানান, আধা লিটার আড়ং ও ফার্ম ফ্রেশ দুধ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দাম বাড়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ভোক্তারাও। মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুর রহমান বলেন, মিল্ক ভিটার দুধের দাম বেড়েছে। এখন অন্যান্য কোম্পানিও হয়তো দাম বাড়াবে। দুধের মূল্যবৃদ্ধির সংগত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এটি মানুষের পুষ্টির অন্যতম সহজলভ্য একটি উপকরণ। তাই উৎপাদন পর্যায়ে সরকার কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও দাম না বাড়ালে আমাদের জন্য ভালো হয়।
মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল বলেন, প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় ১১ থেকে সাড়ে ১১ টাকা বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক অথবা অন্তত সমান সমান অবস্থায় রাখতে এই বাড়তি ব্যয়ের হিসাব করেই দুধের দাম বাড়ানো হয়েছে।

তিনি জানান, মিল্ক ভিটার কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ বিল এক লাফে ৫৫-৫৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৭২-৭৪ লাখ টাকায় উঠেছে। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় এখন এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় আরও বেড়েছে। এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খামারি ও বিপণন পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।

আরও পড়ুন

×