ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রিহ্যাব নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব, আবাসন খাতে স্থবিরতার শঙ্কা

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান নিয়ে বিরোধের শুরু

রিহ্যাব নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব, আবাসন খাতে স্থবিরতার শঙ্কা
×

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের পরিচালনা পর্ষদ। দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের জেরে সংগঠনটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) এক মাসের জন্য স্থগিত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আবাসন খাতের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আসন্ন কর্মসূচি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছে আবাসন শিল্প। বিশেষ করে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ, নিবন্ধন খরচ, করনীতি এবং ফ্ল্যাট বিক্রির ধীরগতিতে ব্যবসায়ীরা চাপে আছেন। নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেটে আরোপিত নতুন কর প্রত্যাহার, বিশেষ আবাসন তহবিল গঠন, ড্যাপ সংশোধন এবং অন্যান্য নীতিগত সহায়তার দাবিতে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিল। তবে বিরোধের কারণে সেসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

রিহ্যাবের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা রিহ্যাবের বিদ্যমান বিরোধে জড়াতে চান না বলে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তারা বলেন, এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে আবাসন খাতে মন্দা পরিস্থিতি চলছে। ইস্যুটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ানো উচিত হয়নি। এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। পারস্পরিক মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব ছিল। এখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। 

মন্ত্রণালয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
রিহ্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ জুলাই সহসভাপতি মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদের ১০ সদস্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ১২ দফা অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে বলা হয়, গত ২২ জুলাই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই সভাপতি ড. আলী আফজাল ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের যৌথ স্বাক্ষরে সংগঠনের ব্যাংক হিসাব থেকে দুই কোটি টাকা তুলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত তিন মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ, নতুন কর্মচারী নিয়োগ, স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন এবং কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়। চিঠিতে এক নারী পরিচালকের সঙ্গে অসদাচরণের বিষয়টিও উঠে আসে। 

এদিকে সভাপতির নেতৃত্বে ১৬ পরিচালক ও সহসভাপতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া পাল্টা ব্যাখ্যায় বলেন, দ্বিতীয় বোর্ড সভায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হঠাৎ নির্ধারিত হওয়ায় নতুন করে বোর্ড সভা ডাকার সুযোগ ছিল না। তাই আগের সিদ্ধান্তের আলোকেই অনুদান দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের খরচ পরবর্তী বোর্ড সভায় অনুমোদনের সুযোগ রয়েছে।

দুই কোটি টাকার অনুদানেই শুরু দ্বন্দ্ব
রিহ্যাবের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দুই কোটি টাকা অনুদান দেওয়া নিয়েই বিরোধের শুরু। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে সব সহসভাপতি ও পরিচালকদের অন্তর্ভুক্ত না করায় একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরে সেটি বোর্ড পরিচালনা, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নেয়।

রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, বোর্ডের ভেতরের মতপার্থক্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ছিল।

জানতে চাইলে সহসভাপতি মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস সমকালকে জানান, তিনি দেশের বাইরে। তবে তাঁর পরামর্শে যোগাযোগ করা হয় পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, রিহ্যাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সভাপতি পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে পারেন না। তাদের আপত্তি অনুদান দেওয়ার বিরুদ্ধে নয়; আপত্তি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় এবং এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে।

তাঁর অভিযোগ, সামার ফেয়ারের তারিখ, ভেন্যু নির্বাচন, স্টল বরাদ্দের অর্থ নির্ধারণ, এজিএমের নোটিশ এবং নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও বোর্ডে আলোচনা না করেই সভাপতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে অন্য পরিচালকরা ক্ষুব্ধ হন।

সভাপতি যা বললেন
রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়া কোনো অনিয়ম নয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঁচজনের নাম পাঠানো হলেও নিরাপত্তা ছাড়পত্র আসে সভাপতিসহ তিনজনের নামে। তাই অন্যদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সেখান থেকেই কিছু সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
সিইও নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা এখন আপত্তি তুলছেন, তারাই নিয়োগপত্রে সই করেছিলেন। এমনকি সিইওর জন্য গাড়ি কেনার কমিটির নেতৃত্বেও অভিযোগকারীদের একজন ছিলেন। স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও সাতজন অফিস বেয়ারারের মধ্যে ছয়জনের সম্মতি ছিল।

ড. আলী আফজালের ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাড়ে তিন মাসে তিনি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে আবাসন খাতের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। কিছু সদস্য সেই উদ্যোগকে মূল্যায়ন না করে অযথা বিরোধ সৃষ্টি করছেন।

তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ডিটিও) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার সমকালকে বলেন, দুপক্ষের বক্তব্য শুনে অভিযোগ তদন্তের জন্য দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনে বিরোধ বাড়ছে, যা কাম্য নয়। সংশ্লিষ্টরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে পারলে সেটিই সবার জন্য ভালো।

আরও পড়ুন

×