বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা ১৩ সিটি করপোরেশনে
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোয় এ সেবা চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানজট ও অভিভাবকদের পরিবহন ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে। ‘বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াতব্যবস্থা প্রকল্প’ শীর্ষক এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
তবে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালে রাজধানীতে বিআরটিসির স্কুলবাস চালু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ব্যর্থ হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, সঠিক রুট নির্ধারণ, পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনাকৌশল তৈরি করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর পাইলট প্রকল্প
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৪ জুলাই প্রকল্প যাচাই কমিটির সভায় এ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক মীর জাহীদা নাজনীন সমকালকে বলেন, ‘সম্ভাব্যতা যাচাইসহ বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু হবে।’
যেভাবে চলবে নতুন বাসসেবা
মাউশির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং যাতায়াতের চাহিদা বিশ্লেষণ করে রুট নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এসব বাস চলবে। বাসের অবস্থান তাৎক্ষণিক জানাতে জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। পর্যায়ক্রমে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস নামানো হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল টিকিটিং বা স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থাও যুক্ত হতে পারে। প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন এলাকায় সেবা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক গণপরিবহনব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে এটি সফল করতে সঠিক রুট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাস, নির্ভরযোগ্য সময়সূচি এবং শিক্ষার্থীবান্ধব ভাড়া নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, শুধু বৈদ্যুতিক বাস কিনলেই হবে না। চার্জিং অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং খুচরা যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে বাসগুলো অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
এক সপ্তাহেই ঝিমিয়ে পড়েছিল স্কুলবাস
শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১০ সালে রাজধানীতে বিআরটিসির উদ্যোগে স্কুলবাস সার্ভিস চালু হয়েছিল। পল্লবী থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ২৬টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪টি বাস নামানো হয়। কিন্তু উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
তৎকালীন বিআরটিসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বাস কিনতে সরকারের প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হলেও প্রতিদিন আয় হতো গড়ে ২০০ টাকার মতো। অথচ পরিচালনায় ব্যয় হতো ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না পাওয়া ও লোকসানের মুখে শেষ পর্যন্ত সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়।
‘পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক’
বিআরটিসির অতীতে ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে অভিভাবকদের অনীহাকে চিহ্নিত করা হয়। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু সমকালকে বলেন, ‘সে সময়ের বাসগুলো ছিল উঁচু, শিশুদের চড়ার উপযোগী ছিল না। বাসে কোনো সহায়ক বা গাইড না থাকায় অভিভাবকরা নিরাপদ বোধ করেননি। রুট নির্বাচনও সঠিক ছিল না।’
তিনি মনে করেন, অতীতের ভুল এড়াতে বাস্তবসম্মত যাত্রী চাহিদা নিরূপণ, স্কুলভিত্তিক না করে ক্লাস্টারভিত্তিক রুট পরিকল্পনা ও সরকারি ভর্তুকির পাশাপাশি টেকসই পরিচালনা কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মঈনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেলের মতে, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করা গেলে এটি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতের পাশাপাশি বড় শহরগুলোর যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এনে দেবে।
- বিষয় :
- বাস