ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার আহ্বান

স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে অংশীজনদের মতামত নেওয়ার আহ্বান
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩৩

দেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের পরিবেশ গড়ে তুলতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। তাদের মতে, কমিশন গঠনের আগে গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, গণমাধ্যম উন্নয়ন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

শনিবার যশোরে ‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। স্থানীয় দৈনিক লোকসমাজ ও দৈনিক গ্রামের কাগজের যৌথ উদ্যোগে এবং মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ডেনমার্কভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্টের (আইএমএস) সহযোগিতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

গণমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআইয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সংলাপে বক্তারা বলেন, গণমাধ্যম কমিশনের স্বাধীনতা, কাঠামো, ক্ষমতা ও জবাবদিহির বিষয়ে শুরু থেকেই অংশীজনদের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মান রক্ষা হয়, অন্যদিকে জবাবদিহি ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করা যায়।

সংলাপের শুরুতে এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নাগরিকদের মতামত বিবেচনায় নিতে হবে।

হাসিবুর রহমান বলেন, খসড়া গণমাধ্যম কমিশন আইনে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার যে ধারণা রয়েছে, সেটিকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কমিশন গণমাধ্যম খাতের জন্য এমন একটি সহায়ক কাঠামো তৈরি করতে পারে, যা সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারেও ভূমিকা রাখবে।

গণমাধ্যমের মালিকানা ও প্রচারসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, সার্কুলেশন সংখ্যা প্রকাশ ও অডিটের ক্ষেত্রে অনিয়ম রয়েছে। পাঠকের আস্থা বাড়াতে এসব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের জন্য একটি কার্যকর আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট) প্রণয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সংলাপে এমআরডিআইয়ের পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনায় স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রেক্ষাপট, প্রয়োজনীয়তা ও বিভিন্ন অংশীজনের প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও পেশাগত মানের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইনসহ বিভিন্ন ধরনের সংবাদমাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় একটি সমন্বিত, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন। স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠিত হলে সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে তা ভূমিকা রাখতে পারে।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, জনস্বার্থে সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণের এখনই সময়। এতে সাংবাদিকতার পেশাগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি জনগণের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত হবে।

কামাল আহমেদ বলেন, সম্পাদকদের জন্য একটি জাতীয় সম্পাদকীয় নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন। তা অনুসরণ না করলে জবাবদিহি বা শাস্তির ব্যবস্থাও থাকা উচিত। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব, সাংবাদিকতার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন প্রয়োজন।

গণমাধ্যম কমিশন আইনের সর্বশেষ খসড়াকে ভিত্তি করে সরকার কাজ শুরু করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ নিয়ে আলোচনা যেন অনির্দিষ্টকাল চলতে না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

শুধু কমিশন গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না বলে মন্তব্য করেন কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামগ্রিক গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার থাকতে হবে। সাংবাদিকতার ন্যূনতম জাতীয় মানদণ্ড ও নৈতিকতার কাঠামো তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

নীতি সংলাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য, কমিশনের কাঠামো ও ক্ষমতা, স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত বলেন, তিনি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে আশাবাদী। তবে কমিশনকেও জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। তাঁর মতে, কমিশনের কাজ গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের পেছনে সরকার ও গণমাধ্যমের মালিক—উভয়েরই দায় রয়েছে। ভালো সাংবাদিকতার জন্য সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা, স্বাধীন সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করে এমন বিজ্ঞাপননীতি এবং সাংবাদিক নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের বিষয়ে জনমত তৈরিতে এ ধরনের আলোচনা আরও হওয়া দরকার। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের মতামত কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

সভায় যশোরের স্থানীয় পর্যায়ের সম্পাদক, সাংবাদিক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও অন্যান্য অংশীজন অংশ নেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

আরও পড়ুন

×