ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছে না ই-জিপি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছে না ই-জিপি: ড. ইফতেখারুজ্জামান
×

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫১

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশের ই-জিপির ওপর টিআইবির একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, প্রক্রিয়াগত কিছু ভালো ফল পাওয়া গেলেও ই-জিপি ব্যবস্থা এখনও ক্রয়-আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের দৃশ্যত অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মিদশায় আবদ্ধ। যোগসাজশের মাধ্যমে দরপত্র দাখিলসহ বিভিন্ন অসাধু চর্চায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদার কর্তৃক বাজার দখলের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ন্ত্রণ কমাতে ই-জিপি তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। 

তিনি বলেন, ই-জিপির মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়া ডিজিটাইজেশন করা হলেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায়নি। বরং ইলেকট্রনিক ক্রয় ব্যবস্থাকেও কুক্ষিগত করে ক্রয় আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সরকারি ক্রয়ের বাজার দখল আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার সমকাল আয়োজিত ‘সরকারি ক্রয়: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল সভাকক্ষে এ বৈঠক আয়োজন করা হয়।  

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১২-২৪ সময়কালে দেশের ৬৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ই-জিপি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মোট ছয় লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৪টি ক্রয়কার্যের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে উঠে এসেছে, ২০১১ সালে চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ই-জিপি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাঁচ লাখ ৯৬ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এ পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ সম্পাদিত ক্রয়াদেশের মূল্য ৮৮১ কোটি টাকা। এর চেয়ে বেশি মূল্যের সব ক্রয় এই প্ল্যাটফর্মের বাইরে রয়েছে। অর্থাৎ শতভাগ সরকারি ক্রয় ই-জিপির মাধ্যমে হচ্ছে, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। গত বছরের এপ্রিলের আগে সরকারি ক্রয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ ই-জিপির বাইরে সম্পন্ন হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে ই-জিপি কভারেজ শতভাগে উন্নীত করতে বিপিপিএ কাজ করছে, যা বর্তমান সরকার অব্যাহত রেখেছে।

তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা যায় প্রায় ৪৬ শতাংশ কাজের জন্য গড়ে চারটির কম করে দরপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রদত্ত কাজের ক্ষেত্রে চারজনেরও কম দরদাতা পাওয়া যায়। প্রতি পাঁচটি কাজের মধ্যে একটি কাজ শুধু একক দরপত্রের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। এতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবের চিত্র স্পষ্ট।

তিনি আরও বলেন, উক্ত মেয়াদে শীর্ষ ১০ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার ই-জিপি পদ্ধতিতে সম্পাদিত মোট ক্রয়মূল্যের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ কার্যাদেশ আদায় করেছে। অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার এক দশকে তাদের বাজার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করেছে।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যাদেশ বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার মোট চুক্তি মূল্যের ৭৪.৯৬ শতাংশ কাজ করেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ ঠিকাদারদের দখল ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অন্যতম সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। এই মন্ত্রণালয়ে ৭.৪৫ শতাংশ ঠিকাদার মোট চুক্তি মূল্যের ৭১ শতাংশ কাজ করেছে। ৮১ জন ঠিকাদার ৩২.৩২ শতাংশ বাজার দখল করেছে। এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এরূপ দখল ১০ শতাংশ বেড়েছে।

বৈঠকে বলা হয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে মাত্র ১১ শতাংশ ঠিকাদার ৯৩.৫৫ শতাংশ মোট চুক্তিমূল্যের কাজ করেছে। ৩৫ জন ঠিকাদারই ৭২.৯ শতাংশ বাজার দখল করেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৯ শতাংশ ঠিকাদার মোট চুক্তি মূল্যের ৯১.৫ শতাংশ কাজ করেছে। মাত্র ৩৮ জন ঠিকাদার ৩০.৯ শতাংশ বাজার দখল করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগে ৯.৭৪ শতাংশ ঠিকাদার মোট চুক্তি মূল্যের ৬২.৮৮ শতাংশ কাজ করেছে।

বাজার দখলের পেছনের অন্যতম স্মার্ট প্রক্রিয়া আইনের দুর্বলতা উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শীর্ষ ঠিকাদাররা যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার গঠন করে বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, সড়ক ও জনপথ বিভাগে ৯টি বড় ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। স্থানীয় সরকার বিভাগে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ১২টি করে প্রধান ঠিকাদারি গ্রুপ চিহ্নিত হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ১১টি ঠিকাদারি গোষ্ঠী সক্রিয় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শীর্ষ ঠিকাদাররা তথাকথিত যৌথ উদ্যোগ গঠনের মাধ্যমে বাজারের বড় অংশ দখল করে রেখেছে। এই ঠিকাদাররা জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে যে চুক্তিমূল্যে কাজ করেছে, তা এককভাবে প্রাপ্ত কাজের পাঁচ গুণ।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে শীর্ষ ঠিকাদারদের আধিপত্য কেবল হাতবদল হয়- এ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র পরিবর্তনের সঙ্গে শীর্ষ ১০ ঠিকাদারি পুরোনো মেয়রের স্থলে নতুন মেয়রের দোসরদের হাতে সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তর হয়। একইভাবে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মেয়র পরিবর্তনের ফলে একইভাবে শীর্ষ ঠিকাদার বদলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মাত্র দুজন ঠিকাদার দুই মেয়রের সময়কালেই কাজ পেয়েছেন, এদের ছাড়া দুই মেয়াদে শীর্ষ ঠিকাদারের তালিকা একেবারে বদলে গেছে। অনুরূপভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পরিবর্তনের সময়ও একই রকম পরিস্থিতি দেখা গেছে। সরকারি ক্রয় খাত সারাবিশ্বেই সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ, তবে বাংলাদেশে তা নিয়ন্ত্রণহীন দখলদারিত্বের হাতে জিম্মিদশায় নিমজ্জিত রয়েছে।

আরও পড়ুন

×