সেফটি ভালভের ত্রুটি, অনিশ্চিত রূপপুরের বিদ্যুৎ
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:২৬
সেফটি ভালভের ত্রুটিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। ভালভের সমস্যা সমাধান না হওয়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না। কবে নাগাদ ত্রুটি মেরামত হবে এবং কখন গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনই কোনো সময়সীমা দিতে পারছে না সরকার।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামি আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্জন তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য ছিল। বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা চালিয়ে ‘বি’ স্টেজ শেষ হয়েছে। তবে দুটি সেফটি ভালভে সমস্যা থাকায় ‘সি’ স্টেজে যাওয়া যাচ্ছে না।
কবে সমস্যার সমাধান হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে আমরা নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছি না। ভালভ দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভালভ দুটি পুরোপুরি পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প সামনে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভালভ এনে প্রথম ইউনিটে বসানো অথবা রুশ ভেন্ডরকে নতুন ভালভ তৈরি করে দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ করা। দ্রুত যে বিকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
নতুন ভালভে সময়ের শঙ্কা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কেন্দ্রের সেফটি ভালভ নিয়ে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা চালানো হলেও তা প্রয়োজনীয় মানে উত্তীর্ণ হয়নি। এখন আবারও পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অত্যাধুনিক সেফটি ভালভ মূলত ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি হয়। শুরুতে ইউক্রেনে ভালভ তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর সেই উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে পরে তুরস্ক থেকে ভালভ সংগ্রহ করা হয়।
নতুন ভালভ তৈরি করে আনতে হলে সময় আরও বাড়তে পারে। কারণ, এ ধরনের যন্ত্র তৈরি ও সরবরাহে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস, কখনও তারও বেশি সময় লাগে।
সেফটি ভালভ রিয়্যাক্টরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কুলিং ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে এটি খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেয়। ফলে যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইনে অতিরিক্ত চাপজনিত ক্ষতির ঝুঁকি কমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভালভের সমস্যা সমাধানের পরও প্রথম ইউনিট থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সেফটি ভালভ কার্যকর হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হবে। এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও গ্রিডে সরবরাহ শুরু করতে অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। কেন্দ্রটি চালুর পরও কয়েক মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও বিভিন্ন পরীক্ষা চলবে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের দুই কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় এ বছর প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
রূপপুরের দুটি ইউনিট চালু হলে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। বর্তমানে দেশে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটে চাহিদামতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে এলে এই সংকট অনেকটাই কমতে পারে। একই সঙ্গে তরল জ্বালানি ও গ্যাসের ওপর চাপ এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল সময়সূচি অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক দফা সময় পিছিয়েছে। চলতি বছরে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও এবার সেফটি ভালভের ত্রুটিতে তা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
- বিষয় :
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র