ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী রুমা বেগম

‘বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে মেয়েকে ধর্ষণ’

‘বাবার কবর জিয়ারত করে ফেরার পথে মেয়েকে ধর্ষণ’
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৪২

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিহত জসিম উদ্দিনের স্ত্রী রুমা বেগম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণে তার বড় মেয়েকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল। পরে মানসিক ট্রমায় তার মেয়ে আত্মহত্যা করেন বলেও দাবি করেন তিনি।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রুমা বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সেখানে তিনি তার স্বামী জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনাও বর্ণনা করেন।

রুমা বেগম বলেন, তার স্বামী মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র ‘পদক্ষেপ’ নামের একটি এনজিওতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ পড়তে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সন্ধ্যায় প্রতিবেশী কোহিনুর বেগম তাকে জানান, তার ছেলে উজ্জল ফোন করে বলেছেন, জসিম উদ্দিন আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে পড়ে আছেন।

রুমা বলেন, খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে একটি ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান। তখন তার জ্ঞান ছিল। জসিম তাকে জানান, গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে গেছে এবং বুকে গুলি লেগেছে। রুমা বলেন, তিনি দেখতে পান, গুলিটি বুক দিয়ে ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে।

রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজের পর তার স্বামী মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে যান। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন বলে জসিম তাকে জানান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ জুলাই তার মৃত্যু হয়।

রুমা বলেন, নানা জটিলতার পর ৩১ জুলাই স্বামীর লাশ পান। পরে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকীতে যান এবং ৩১ জুলাই সকাল আটটার দিকে দাফন করেন।

এরপর ঢাকায় এসে ফেসবুক, ইউটিউব, সংবাদপত্র, বিভিন্ন ভিডিও ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে স্বামীর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন বলে ট্রাইব্যুনালে জানান রুমা। তিনি বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক এলাকায় ভাড়া থাকি এবং সেখানে অভিযুক্তদের কয়েকজনকে আগে থেকেই চিনি।

‘সাক্ষ্য দিতে আসার কারণে মেয়েকে ধর্ষণ’
রুমা বেগম বলেন, মামলার সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে গত বছরের ১৭ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন তার ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম। তার বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।

রুমার ভাষ্য, পরদিন ১৮ মার্চ লামিয়া তার বাবার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। তার দাবি, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই তার মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়।

রুমা বলেন, এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তার মেয়ে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হন এবং পরে আত্মহত্যা করেন। এ কথা বলতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে স্বামী জসিম উদ্দিন হত্যার বিচার দাবি করেন।

‘এসপির নির্দেশে দুজনকে ক্রসফায়ার’
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ২০১৫ সালে বিএনপির দুই নেতাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মো. মুজিবুর রহমান।

সোমবার ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

জবানবন্দিতে মুজিবুর রহমান বলেন, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই দিন পয়সার হাট এলাকায় চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে সন্ধ্যা আটটা থেকে পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব শেষে সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার দিকে থানায় ফিরে জানতে পারেন, দুজন ব্যক্তি মারা গেছেন।

তিনি বলেন, অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে বাসায় চলে যান। বিকেলে পরবর্তী দায়িত্বের বিষয়ে জানতে থানায় এসে দেখতে পান, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ থানায় আনা হয়েছে। অভিভাবকদের কাছে লাশ হস্তান্তরের জন্য ডাকা হয়।

মুজিবুর রহমানের ভাষ্য, পরে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কানাঘুষা থেকে তিনি জানতে পারেন, পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহর নির্দেশে এএসআই জসিম ও মাহাবুল ওই দুজনকে ‘ক্রসফায়ার’ দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন পর থানার মুন্সি এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন কি না জানতে চান। তখন তিনি জানান, তিনি পয়সার হাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ওই ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন না। তিনি কোনো গুলি করেননি এবং ঘটনাস্থলেও যাননি। দায়িত্ব শেষে থানায় ফেরার পর ঘটনাটি জানতে পারেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেন। মামলায় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, এহসানউল্লাহ, মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার আছেন।

আরও পড়ুন

×