ঢাকা-চট্টগ্রামে জুলাই হত্যা ও নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন সাক্ষী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী মো. জাকির হোসেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে গতকাল বুধবার তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমার বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ওই দিন নিউমার্কেট ২ নম্বর গেটে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ছোড়া গুলিতে আবদুল ওয়াদুদ নামে পরিচিত একজন ব্যবসায়ী নিহত হন। আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে শহীদ হন আরও এক আন্দোলনকারী। এ ছাড়া একই দিন জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড্ডা, রামপুরা এলাকায় ছয়-সাতজন প্রাণ হারান। এর মধ্যে ১১ বছরের শিশু তামিম শিকদারও রয়েছে। আমি নিজেও কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।’
জাকির হোসেন আরও বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ১৪ দলের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কারফিউ জারি ও আন্দোলনকারীদের দেখা মাত্রই গুলি করার সিদ্ধান্ত জানান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বৈঠকে তাঁর পাশে ছিলেন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। পরদিন ২০ জুলাই সকাল থেকে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ঢাকার বাসায় বাসায় তল্লাশি শুরু করে। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মারধর করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বইপুস্তক পুড়িয়ে দিয়ে টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়। এভাবেই চলতে থাকে নির্যাতন।
৫৫ বছর বয়সী জাকির জানান, আন্দোলনের সময় ২৪ জুলাই পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি। তাঁর গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ায়ও পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা হামলা চালায়। ২৬ জুলাই পুনরায় ঢাকায় ফিরে আসেন এই সাক্ষী।
তিনি বলেন, ‘৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অংশ নিই। আমার সঙ্গে থাকা আন্দোলনকারী চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র একেএম নুরুল্লাহর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য গুলি লাগে। তাঁর রানে একটি গুলি লেগে মাংস ছিঁড়ে যায়। ছেলেটি পঙ্গু হয়ে গেছে। ওই দিন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা, বকশিরহাট, কোর্ট এলাকা, নিউমার্কেট এলাকা, ষোলোশহর, ওয়াসা মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের গুলিতে হাজারো আন্দোলনকারী আহত ও নিহত হন। তাদের মধ্যে আমার তিনজন কর্মচারীর গায়ে ছররা গুলি লাগে। ৪ আগস্ট রাতে ঢাকায় চলে আসি।’
জাকির বলেন, ‘একই দিন বিকেল ৩টার দিকে আমার বন্ধু খলিলুর রহমান ফোনে জানান, বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি গলির মধ্যে তারা আটকে আছেন। সেখানে গিয়ে তাঁর শরীরে সাত শতাধিক ছররা গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। পরবর্তী সময়ে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সরকারের সহায়তায় পাঁচ মাস ধরে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে দেশে আছেন খলিল।’
জুলাই আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা ও আহত করার জন্য শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন এবং কামরুল ইসলাম। তিনি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। এ মামলার আসামি কামরুল ও মেনন সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যা, অভিযোগ গঠনের আদেশ ১৬ সেপ্টেম্বর
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর আদেশের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বুধবার উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই দিন ঠিক করেন।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম। আসামিপক্ষে ছিলেন এম লিটন আহমেদ। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন ও এম হাসান ইমাম।
এ মামলার ২৬ আসামির মধ্যে সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিনসহ আট আসামি কারাগারে। ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীমসহ এই মামলার ১৮ আসামি পলাতক। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
- বিষয় :
- ট্রাইব্যুনাল