সেই দুই শিশুকে এখন ঘুম পাড়াতে কষ্ট
মুক্তা ইসলাম মাওয়া, দুই সন্তান ও সোহেল শিকদার। ছবি-সংগৃহীত
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০০ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘দুই ভাইবোন ভাত-পানি কিছু খাইতে চায় না। চিপস, জুস দিলে একটু নেয়। দিনে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করে কাটায়। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে শুধু কইতে থাকে– আম্মু যাব, আম্মু যাব। হাত-পা ছুড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা কষ্ট হয়ে যায়।’ –কথাগুলো বলতে বলতেই চোখে পানি এসে যায় মিনারা বেগমের। শিশু দুটি তাঁর মেয়ে মুক্তা ইসলাম মাওয়ার। গত ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার আগে তিনি স্বামীর হাতে বর্বর নির্যাতনের শিকার হন।
বরিশালের বাকেরগঞ্জের শরসী এলাকার বাসিন্দা মিনারা বেগম। ৫ বছরের নাতি সাফওয়ান শিকদার ও ৪ বছরের নাতনি তাসফিয়া শিকদার এখন তাঁর কাছে থাকে। গতকাল বুধবার ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।
মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মিনারা বেগম। আগে থেকে নানা রোগে ভুগছিলেন, এখন আরও ভেঙে পড়েছেন। মুক্তার দুই শিশুসন্তানকে কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেন।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির তৃতীয় তলা থেকে মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার তিন দিন আগে মুক্তাকে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে পেটান স্বামী সোহেল শিকদার। তখন পাশের রুমে কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান সাফওয়ান ও তাসফিয়া। এ সময় মুক্তা তাঁর স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
গতকাল মিনারা বেগম বলেন, ‘মেয়েটাকে এভাবে হারাতে হবে, এটা কল্পনায়ও ছিল না। এভাবে এত কিছু হয়ে যাবে, আমরা বুঝিনি। শরীরের ওপর কী নির্যাতনটা চালানো হয়েছে! আমার শরীরও খারাপ।’
মুক্তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোহেল শিকদার বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে মুক্তার পুরো শরীর রক্তাক্ত জখম করে প্রায় ৩ মিনিটের ভিডিও ধারণ করে। এরপর সেটি মুক্তার ভাই তারেক হাওলাদারের মোবাইল ফোনে পাঠায়।
তারেক গতকাল সমকালকে বলেন, ১ আগস্ট রাত ৮টার দিকে সোহেল শিকদার ফোন করে আমার বোনকে খিলক্ষেতের বাসা থেকে বাকেরগঞ্জে নিয়ে যেতে বলেন। কী হয়েছে– জানতে চাইলে সোহেল বলেন, আজ রাতেই মুক্তাকে নিয়ে যাও। তখন বোনজামাইকে বুঝিয়ে বলছিলাম, একটা দিন সময় দেন। এরপর মাকে নিয়ে ঢাকায় আসব।
তারেক জানান, কথা বলার এক পর্যায়ে সোহেল বলেছিলেন, ৫ বছরের ছেলে সাফওয়ানকে তাঁর কাছে রাখবেন। ৪ বছরের মেয়ে তাসফিয়াকে মুক্তার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এটা জানার পর মনে হয়েছিল, হয়তো রাগ কমলে সব ঠিক হয়ে যাবে। যেহেতু ভাগনেকে সোহেল তাঁর কাছে রাখতে চেয়েছেন; তাই বিশ্বাস ছিল, ঝগড়া হলেও মিটমাট হবে।
তারেক জানান, সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। নিয়োগপত্র আনতে ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল পর্যন্ত বরিশাল সেনানিবাসে ছিলেন। এ কারণে সারাদিন মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। সন্ধ্যার পর মাকে নিয়ে বাসে করে ঢাকায় বোনের বাসার উদ্দেশে রওনা হন তারেক। বরিশাল শহর থেকে বাস কিছুদূর আসার পর ফোনে ঢাকা থেকে স্বজনরা কল দেন। প্রথমে কিছু বলতে চাননি। চাপাচাপি করলে মন শক্ত রাখার কথা বলতে থাকেন। তখন মনে নানা শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে এক চাচাতো বোন জানান, মুক্তা আর নেই। তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আরও এক আত্মীয় একই কথা জানান। এরপরই চলন্ত বাসের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন তারেক। ওই সময় তারেক ও তাঁর মাকে বাস থেকে ধরাধরি করে নামানো হয়। কিছু সময় পর সংজ্ঞা ফিরলে মাকে নিয়ে বরিশাল থেকে বাকেরগঞ্জের দিকে রওনা হন তারেক।
তারেক বলেন, বাসে পাশের সিটে থাকলে তখনও আমার মা বুঝতে পারেননি মুক্তার কী হয়েছে। গ্রামে ফিরে আসার পর ধীরে ধীরে টের পান। ততক্ষণে ঢাকা থেকে বোনের লাশ নিয়ে আত্মীয়স্বজনরা রওনা দিয়েছিলেন।
তারেক বলেন, ১৬ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা আমাদের চার ভাইবোনকে বড় করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি সংসারের হাল ধরেছি। কয়েক বছর ধরে মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। কয়েক দিন আগে মুক্তা তাঁর স্বামী-সন্তান নিয়ে মুন্সীগঞ্জে আমার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। ১৫ দিন ছিল। তখন সোহেল শিকদার ব্যবসা করার কথা বলে আমার কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। কিছুদিন অপেক্ষার পর গ্রামে গিয়ে ঋণ করে টাকা দেব বলে জানিয়েছি। বোনের সংসারে সুখের জন্য অভাব-অনটনের মধ্যেও ভাই হিসেবে সাধ্যের বাইরেও কিছু করার চেষ্টা করতাম। আমার সরকারি চাকরি হওয়ায় বোন খুব খুশি ছিল।
তারেক বলেন, গত ঈদের সময় খিলক্ষেতে মুক্তার বাসায় ছিলেন তাঁর মা মিনারা বেগম। তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তখন তাঁর সামনে মুক্তাকে পিটিয়ে আহত করেন সোহেল।
মুক্তার পরিবারের সদস্যরা জানান, স্ত্রীর লাশ উদ্ধারের পর যখন খিলক্ষেতের বাসায় পুলিশ যায়, তখন সোহেল তাঁর এক আত্মীয়কে মুক্তার বোন পরিচয় করিয়ে দেন। ময়নাতদন্ত করার সময় ওই পরিচয় ব্যবহার করেন।
মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজীব ভৌমিক সমকালকে জানান, মুক্তার স্বামী সোহেল পুলিশকে ফোন করে ঘটনাটি জানান। এরপর তিনি তাদের বাসায় যান। নারী পুলিশ সুরতহাল করেন। বাসায় গিয়ে তারা মেঝেতে লাশ পেয়েছেন। মুক্তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল দাবি করেন, সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেন মুক্তা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে হত্যা নাকি আত্মহত্যা এটি পরিষ্কার হবে। সোহেলকে ঘটনার দিন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে পাঁচ দিনের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
বাকেরগঞ্জের একই এলাকার বাসিন্দা সোহেল শিকদারের সঙ্গে সাত বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় মুক্তার। এরপর মুক্তা খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকতেন। তাঁর স্বামী শুরুতে খিলক্ষেত এলাকার মুদি দোকানি ছিলেন। সেই ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে না পেরে তিনি এমব্রয়ডারি ব্যবসায় জড়ান। সেখানেও ভালো করতে পারেননি। এরপর শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক চাওয়া শুরু করেন তিনি। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ ও যৌতুকের জন্য কয়েক মাস ধরে মুক্তাকে নির্যাতন করে আসছিলেন সোহেল।
পায়ে শিকল বেঁধে স্ত্রীকে ভয়াবহ নির্যাতন নিয়ে মঙ্গলবার সমকালের প্রথম পাতায় ‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঘটনাটি অসংখ্য মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়।