সংসদে প্রধানমন্ত্রী
অদৃশ্য ইশারায় বঙ্গোপসাগরে গ্যাস তোলার চেষ্টা হয়নি
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যাকে অজুহাত করাতে চাই না
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দেন পিআইডি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৮ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ডানে ও বাঁয়ে যে প্রতিবেশী দেশ আছে, তারা সমুদ্র থেকে গ্যাস আহরণ করছে। অদৃশ্য কোনো ইশারায় দেশের সীমানায় বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলোর গ্যাস আহরণের উদাহরণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ কোনো দেশকে সুবিধা দিতে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে বঙ্গোপসাগরে খননকাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রচলিত ধারণার কথা তিনি সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার দেশকে সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতির সমাপনী সম্পর্কিত বাণী পাঠের মধ্য দিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে। সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে তা তিনি দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যই ছিল আমাদের গ্যাস আমদানির প্রধান উৎস। ঠিক এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের পরে শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে তেল ও গ্যাস আমদানি করা হতো তাতে বাধার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের দুটি এফএসআরইউর একটিতে দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা একটি বাড়তি বিপদ যোগ করে। যার কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে দেশের মানুষের এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ’
সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি যতবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে দেশকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে পেরেছে। প্রতিটি সংকটে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এবং তাঁর দল বিএনপি দেশের হাল ধরেছে এবং সফল হয়েছে।
কুইক রেন্টালের নামে রাষ্ট্রকে ফতুর করে দেওয়া হয়েছে
বিগত আমলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে অফিস ও স্কুল সময় পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা কোনো অজুহাত তুলে জনগণের সমস্যাকে এড়িয়ে যেতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ২০০৯ সাল থেকে যারা বছরের পর বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল, মানুষের কথা বলার ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাদেরও বিদ্যুৎ সমস্যা মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তথাকথিত বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে কুইক রেন্টাল বসানো হয়েছিল। এই কুইক রেন্টালের নামে কিছু মানুষকে সুবিধা দিয়ে এই রাষ্ট্রকে ফতুর করে দেওয়া হয়েছে। ঋণগ্রস্ত করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও তারা বিদ্যুৎ সমস্যা, জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করে আনতে পারেনি।
সবাইকে মিলে কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়তে হবে
তারেক রহমান বলেন, এই দেশে স্বাধীনতা অর্জন, রক্ষা ও সার্বভৌম রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে লাখো মানুষ জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সালেও গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হয়েছিল। ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ পবিত্র কর্তব্য বলে বিশ্বাস করি। রক্তের ঋণ পরিশোধ যেহেতু আমাদের দায়িত্ব, এ জন্য একটি দলকে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। একটি দলকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দিয়েছে। সুতরাং, সরকারি দলই বলি আর বিরোধী দল বলি, আমরা সবাই মিলে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ, বিরোধ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিড়াড়িত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্জীবিত করতে পারে। এটি যেন আমরা ভুলে না যাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে, শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে অবশ্যই আমাদের ঐকবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকবে। সারা পৃথিবীতে থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
সমস্যা সমাধানে সংসদই কেন্দ্রবিন্দু
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, জাতির সমস্যা সমাধানে এই সংসদকে আমরা কেন্দ্রবিন্দু করতে চাই। আমরা সংসদে সকল ক্ষেত্রে কার্যকর করতে পেরেছি তা হয়তো নয়, তবে আমাদের কারোরই সদিচ্ছার অভাব ছিল না তা নিশ্চয় প্রমাণিত হয়েছে। আমরা উভয় পক্ষ দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থে যে কাজ করছি, উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘এই সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। এই সংসদে আলোচনা করে তাদের সমস্যার সমাধান করবে। তাদের জন্য শান্তি বয়ে আনবে– এটা সবার আশা। আমরা সরকার গঠনের পর থেকেই জনজীবনে সমৃদ্ধি, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কাজ করে চলেছি।’
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যায় অজুহাত নয়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা– প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতির পাহাড়। এ বিষয়ে দেশের জনগণ ও এই সংসদ অবহিত। উত্তরাধিকার সূত্রে ফ্যাসিবাদী শাসনের এসব সমস্যাকে আমরা অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চাই না। এই সমস্যাগুলোর ব্যাপারে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাই। পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে চাই।’
গাড়ির লংমার্চে সমস্যার সমাধান হবে না
বিরোধী দলের লংমার্চের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে আমরা বিরোধী দলের বন্ধুদের কাছে সহযোগিতা আশা করেছিলাম। অথচ আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ বলে, জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা হয়েছিল কিনা? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।’
বাক্স্বাধীনতা যেন শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে
দেশে এখন বাক্স্বাধীনতা অবারিত হলেও তা যেন কোনোভাবেই শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি রাজনীতি থেকে গালাগালির সংস্কৃতি পরিহার করারও তাগিদ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক ও বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে, বাক্স্বাধীনতা অবারিত। পারিবারিক পরিবেশে আমরা যেসব শব্দ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপ্রতিনিধি হয়ে কেন আমরা সেই শব্দগুলো জনপরিসরে ব্যবহার করব? কেন আমরা সেগুলো পরিহার করব না? আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন গালাগালিতে পরিণত না হয়। আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং একটি রুচিশীল সমাজ গঠন করি।’
ফ্যাসিবাদী আমলের খেলাপি ঋণ ৩৫.৫%
ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, ‘তারা শুধু লুটপাট ও অর্থ পাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, খেলাপি ঋণের হিসাবেও জালিয়াতি করেছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অথচ আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ফরেনসিক অডিটে দেখা যায়, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। তবে আমাদের সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে গত পাঁচ মাসে তা কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।’
রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা দেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছেন, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কিন্তু এই দেশের কাঁধে যে ঋণের বোঝা, তা আমাদেরই শোধ করতে হচ্ছে।’
- বিষয় :
- প্রধানমন্ত্রী
- সংসদ