কিছু বিষয়ে অপপ্রয়োগের শঙ্কা বিবেচনার আশ্বাস সরকারের
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনে আবার কাজ শুরু করেছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর কিছু বিষয়ে অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করছেন গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্টরা। তবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বলেছেন, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে এমন কোনো শব্দ বা বিধান রাখা হবে না, যার অপব্যবহার করে গণমাধ্যম বা অন্য কারও কণ্ঠ দমন করা যায়।
জানা গেছে, বাতিল হওয়া বিতর্কিত ডিজিটাল আইনের গণমাধ্যমবিরোধী ধারার কিছু বিষয়বস্তুও সংশোধনী আইনে যুক্ত করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যম ভুক্তভোগী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্টরা আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে আলাদা রাখা অথবা গণমাধ্যমের জন্য রক্ষাকবচ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনার জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উদ্যোগে একটি পরামর্শ সভা হয়। এতে গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এসব কথা বলেন।
সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। গত ২৯ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রী। এ কমিটি ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
গতকাল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এবং সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গণমাধ্যমের বিষয়টি কী হবে তা স্পষ্ট করার পরামর্শ
ডেইলি স্টারের কনসালট্যান্ট এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনে বলা হয়েছে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা করবেন। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিও মামলা করছেন এবং আদালত সেই মামলা গ্রহণ করছেন, আসামিরা জামিনও পাচ্ছেন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ হলে পুলিশ এ ধরনের মামলা গ্রহণ করতে পারে না। তিনি বলেন, তাঁর আশঙ্কা, যতই কঠিন আইন করা হোক না কেন, সেটির অপপ্রয়োগ হলে ওই আইন করে কোনো লাভ হবে না। সুতরাং, অপপ্রয়োগের ঝুঁকি কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেটি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
প্রস্তাবিত আইনের ২৬ ধারায় অপতথ্যের ব্যাখ্যা অস্পষ্ট, ব্যাপক ও বিমূর্ত বলে মনে করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে ভুক্তভোগী করার আশঙ্কা আছে। অতীতেও এর উদাহরণ রয়েছে। ফলে এসব বিষয় আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করা দরকার। একই সঙ্গে এখানে গণমাধ্যমের বিষয়টি কী হবে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার।
সময় টিভির সিইও জুবায়ের বাবু বলেন, ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটাকে যদি এর আওতায় আনা না যায়, তাহলে সাইবার সুরক্ষা বলা হোক বা সামাজিক মাধ্যমের সুরক্ষার কথা বলা হোক– কোনোটিই কাজ করবে না।
আমার দেশের যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, প্রস্তাবিত আইনে সুকৌশলে ডিজিটাল আইনের গণমাধ্যমবিরোধী ধারার কিছু বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়েছে, যা উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, গণমাধ্যমকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, অনলাইন গণমাধ্যমকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়, একই সঙ্গে সমাজকেও কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়–সেসবের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই আইনটি করা হচ্ছে, যাতে এর অপপ্রয়োগ না হয়।
অনুষ্ঠান শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আইনের কিছু শব্দের দ্বৈত অর্থ থাকায় সেগুলো নিয়েও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইনে কীভাবে বিশেষ করে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা বেশি উদ্বিগ্ন। আরও আলোচনার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর আবার সভা ডাকা হয়েছে।’
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে সাইবার অপরাধ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। সেই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আমরা এক রকমভাবে খসড়া করেছি। এখন অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করছি।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, তিনিও মনে করেন, মেটাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে বাংলাদেশে তাদের অফিস করা উচিত।
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, এটি সাইবার সুরক্ষা আইন। এখানে প্রিন্ট মিডিয়ার কিছু নেই।
পরামর্শ সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম প্রমুখ।
- বিষয় :
- সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ