ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯/১১-এর ২৫ বছর: ৪ উড়োজাহাজে ১৯ ছিনতাইকারীর যে হামলা বদলে দিয়েছিল বিশ্ব

৯/১১-এর ২৫ বছর: ৪ উড়োজাহাজে ১৯ ছিনতাইকারীর যে হামলা বদলে দিয়েছিল বিশ্ব
×

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার পর জ্বলছে টুইন টাওয়ার। ছবি: রয়টার্স

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৩ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৯

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দিন। সেদিন আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে আত্মঘাতী হামলা চালান। দুটি উড়োজাহাজ আঘাত হানে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। আরেকটি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। চতুর্থ উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন।

আজ সেই হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এক দিনের ওই ঘটনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থাই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের গতিপথ।

হামলার নেতৃত্বে ছিল ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা। তবে ৯/১১ হঠাৎ করে ঘটেনি। এর আগে আল-কায়েদা ১৯৯৮ সালে আফ্রিকায় দুটি মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেন উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলা চালিয়েছিল। বিন লাদেন প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

তারপরও ২০০১ সালের হামলা ঠেকানো যায়নি। হামলার আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আল-কায়েদা ও সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ছিল। কিন্তু সিআইএ ও এফবিআইয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে আদান-প্রদান হয়নি। একাধিক গোয়েন্দা তথ্যের ‘টুকরোগুলো’ একসঙ্গে জোড়া লাগানো যায়নি। পরে ৯/১১ কমিশন এটিকে বড় ধরনের গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে।

হামলার মাত্র নয় দিন পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। ২০০১ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো। পরে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।

পরবর্তী দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘ যুদ্ধ চলে। সন্ত্রাস দমনের নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিযান, আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও নজরদারি বাড়ানো হয়। গুয়ানতানামো বে কারাগারে বিচার ছাড়াই বন্দী রাখা এবং ইরাক-আফগানিস্তানে বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের পাশাপাশি মানবাধিকার নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়।

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র নিজের গোয়েন্দা কাঠামোও ঢেলে সাজায়। গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি বাড়ানো হয়, তৈরি করা হয় ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার এবং ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পদ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতাও জোরদার হয়।

গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর মতো মাত্রার আর কোনো হামলা হয়নি। তবে সন্ত্রাসী হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ইসলামপন্থী সহিংসতার শতাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরং এখন হুমকির ধরন বদলে গেছে। আল-কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের মতো সংগঠনের পাশাপাশি ‘লোন উলফ’ বা এককভাবে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিদের হামলা, ডানপন্থী উগ্রবাদ এবং অনলাইন উগ্রপন্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

এদিকে ৯/১১-এর পর দুই দশক ধরে সন্ত্রাস দমনে বিপুল সম্পদ ব্যয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগ এখন রাশিয়া ও চীনের দিকে বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সন্ত্রাসবাদকে তুলনামূলক কম অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে আবারও গোয়েন্দা সক্ষমতা ও অভিজ্ঞ জনবল কমে যেতে পারে। বাজেট কমানো, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের চলে যাওয়া এবং আত্মতুষ্টি-এই তিনটি বিষয়কে বিশেষ ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন তারা।

সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ২৫ বছর পর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রশ্নটি নতুন করে ফিরে এসেছে-হুমকির ধরন বদলালেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি সতর্কতা হারাচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ৯/১১-এর আগে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও তথ্যের সমন্বয়হীনতা ছিল, তা যেন আবার ফিরে না আসে।

৯/১১-এর ২৫ বছর পরও সেই দিনের শিক্ষা তাই একই: শুধু তথ্য থাকা যথেষ্ট নয়, সঠিক সময়ে তথ্যকে কাজে লাগানো এবং সম্ভাব্য হুমকিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা—নিরাপত্তার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
 

আরও পড়ুন

×