বাউফলের মৃৎশিল্প
লোডশেডিংয়ে বন্ধের পথে অর্ধশত কারখানা
দিনরাত মিলিয়ে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না
জিতেন্দ্র নাথ রায়, বাউফল (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২১ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কমল মৃৎশিল্পী অ্যান্ড কোম্পানির উৎপাদন ব্যবস্থাপক বিমল চন্দ্র পাল (৫৬)। প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ৪৫ হাজার টাকা বেতন পান। এই টাকা দিয়ে বেশ ভালো চলছিল তাঁর চার সদস্যের সংসার। এখন তাঁর সংসারে টানাটানি শুরু হয়েছে। কেননা প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁর বেতন কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। ফলে পরিবারের ভরণপোষণ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।
মালিকপক্ষ জানান, দিনে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে খরচ বেড়ে গেছে, উৎপাদনও কমে গেছে। ফলে কর্মীদের বেতন না কমিয়ে উপায় নেই।
এ অবস্থা শুধু বিমল চন্দ্রের কিংবা তাঁর কোম্পানির নয়। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাউফল ও মদনপুরার পালপাড়ার সব কারখানা কিংবা কর্মীর একই অবস্থা। সেখানে মাটির পণ্য তৈরির অর্ধশত কারখানা রয়েছে। সেগুলোর একটি কমল মৃৎশিল্পী অ্যান্ড কোম্পানি। এর মালিক কমল পাল। তাঁর মতো সব প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিংয়ে বিপদে পড়েছেন। বিপাকে পড়েছেন কর্মীরাও।
বাউফল-বরিশাল মহাসড়কের পাশে কাগজীর পুল বাসস্ট্যান্ড। মহাসড়কের পাশে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের সারি সারি দোকান। তাকালে চোখে পড়ে রং-বেরঙের মাটির তৈরি জিনিসপত্র। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি তৈজসপত্র সবার নজর কাড়ে। মহাসড়ক ধরে চলাচলকারী সৌখিন ব্যক্তিরা গাড়ি থামিয়ে সেসব জিনিস দেখেন, কেনেনও অনেকে। ফুলের ছোট-বড় টব, খেলনা, মানচিত্র, কাপ, পিরিচ, থালা-বাসন কী নেই সেখানে।
কমল পাল (৫২) ছোটবেলা থেকে মাটির জিনিস তৈরিতে হাত পাকিয়েছেন। ছোট পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসায় নামেন। মাটির তৈরি প্রায় ৫৮ ধরনের শোপিচ, ক্রোকারিজ, থালা-বাসন, বাটি, কাপ-পিরিচসহ নানা ডিজাইনের পণ্য আড়ংসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ করেন তিনি। তাঁর দুটি কারখানা। বেশ ভালোই চলছিল। নারী-পুরুষ মিলিয়ে ২০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে নানা কারণে তাঁকে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হচ্ছে।
কমল পাল বলেন, ‘দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এক ঘণ্টা পর পর দেখা মেলে। তেল কিনে আর পারছি না। জেনারেটর চালু করে বাধ্য হয়ে ফরমায়েশি পণ্য তৈরি করে সরবরাহ করতে হয়। ফলে তেলের খরচও বেশি যায়, উৎপাদনও কম হয়।’
কমল পাল, বরুণ পাল, গৌতম পালসহ সবার একই কথা। তারা জানালেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না করা গেলে এ পেশায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
বিমল পাল নামের এক কর্মী জানান, চারজনের সংসার তাঁর। পরিবার নিয়ে পালপাড়াতে থাকেন। জমি বলতে দুই শতাংশের ওপর বসতঘর। হাতের কাজ করে তাঁর সংসার চলে। দুই সন্তানের পড়াশোনাসহ ভালো চলছিল সংসার। মাসে ৪০-৪৫ হাজার টাকা রোজগার হতো। লোডশেডিংয়ের কারণে কাজ কমে রোজগার অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে সংসার চালাতে কষ্ট হয়।
শিশির পাল, বরুণ পাল ও সমির পাল জানান, তাদের ছয়টি কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোয় তৈরি জিনিস ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় যথাসময়ে সরবরাহ করতে না পারলে অর্ডার বাতিল করে দেয় কোম্পানিগুলো। এতে তাদের বড় ক্ষতিতে পড়তে হয়।
শিশির পাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের এ পালপাড়ায় দেড় থেকে দুই হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমরা তাদের কর্মের জন্য মজুরি দিই। দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এই সময়ে আমাদের জেনারেটর চালু করে উৎপাদন চালু রাখতে হয়। ফলে উৎপাদন কম হয়, আবার খরচও বেড়ে যায়। ফলে লাভ থাকে না বললে চলে।’
জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বাউফল জোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বাউফলে প্রতিদিন ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা। আমরা পাই ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। ফলে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর আবার এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিতে পারি গ্রাহকদের।’
- বিষয় :
- মৃৎ শিল্প