পাখি
পক্ষীর খালের কীট-কুড়ানি
পোকা মুখে পক্ষীর খালের ছইলা গাছে নীলাভ কীট-কুড়ানি লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৪ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে সুন্দরবনের কালাবগী, শেখেরটেক ও কোকিলমনি হয়ে চতুর্থ রাতে আমাদের ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’ নোঙর করল পক্ষীর খালের মুখে। ৯ বছর ধরে সুন্দরবনের পাখি-প্রাণী পর্যবেক্ষণে যত লঞ্চে ঘুরেছি, এটি তার একটি। খুব ভোরে উঠতে হবে, তাই রাতে খাবার সেরে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে উঠেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ঘন কুয়াশার চাদরে চারদিক ঢেকে আছে। ফজরের নামাজ পড়ে কুয়াশা কাটার অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাভ হলো না। কুয়াশার ঘনত্ব কমলেও পুরোপুরি কাটল না।
সকাল ঠিক ৮টায় লঞ্চের সঙ্গে নিয়ে আসা নৌকায় উঠে পক্ষীর খালের দিকে রওনা হলাম। দুই মিনিটের মাথায় একটি বনমোরগের সঙ্গে দেখা। কিন্তু কুয়াশার কারণে ছবি ভালো হলো না। পরের আধ ঘণ্টায় বানর, ধবল ঘুঘু, থোড়মোচা মাছরাঙা, কেশরাজ, ছোট সহেলি ও তিতপোখের দেখা পেলাম। কিন্তু একটি পাখি-প্রাণীর মধ্যেও কোনো উচ্ছলতা দেখলাম না। সবাই গাছের ডালে জবুথবু হয়ে বসে ছিল।
নৌকা খালের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছে। ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা বেজে ২৯ মিনিট ৫০ সেকেন্ড। ঠিক তখন কালো কপাল ও গোলাপি ঠোঁটের নীল রঙের ছোট্ট একটি চঞ্চল পাখিকে ছইলা গাছের ডালে লাফালাফি করতে দেখলাম। ওর চঞ্চলতায় আমরাও উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। দ্রুত ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শাটারে ক্লিক করে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যে চঞ্চল পাখিটি একটি ছোট্ট সাদা মথ শিকার করে উদরে চালান করল।
পাখিটিকে সর্বপ্রথম দেখেছিলাম ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল সকালে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। এরপর যতবার সুন্দরবনে এসেছি, প্রায় ততবারই গাছের ডালের নিচ দিয়ে হাঁটতে সক্ষম পাখিটিকে দেখেছি।
সুন্দরবনের পক্ষীর খালের ছইলা গাছের ডালে দেখা অতি চঞ্চল পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি নীলাভ কীট-কুড়ানি। কালো-কপাল বনমালী, নীল চোরা বা খোঁচাটুনি নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে বেগুনি চোর পাখি। Velvet-fronted Nuthatch এ পাখির ইংরেজি নাম। সিট্টিডি (Sittidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Sitta frontalis (সিট্টা ফ্রন্টালিস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
নীলাভ কীট-কুড়ানি আকারে ছোট পাখি। লম্বায় মাত্র ১০ সেন্টিমিটার, ওজনে ২৪ গ্রাম। ঘন কালো মখমলের মতো কপাল। চোখের পেছনে সরু কালো ডোরা। ঘাড়-মাথা-পিঠ ও লেজের উপরিভাগ চকচকে নীল। থুতনি ও গলা সাদা। ওড়ার পালকের আগা কালো। বুক-পেট-চিবুক ঝকঝকে পীতাভ-বাদামি। স্ত্রীর চক্ষুডোরা নেই। ছোট ঠোঁটটি গোলাপি। পা ও পায়ের পাতা পাটকিলে-বাদামি, পায়ের তলা কমলা-হলুদ। আঙুল লম্বা, নখ আংটার মতো হওয়ায় সহজেই গাছের ডালের নিচের দিকেও হাঁটতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঠোঁট কালচে ও অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল। তার ধূসর দেহতলে কমলা-পীতাভের আভা থাকে।
এরা মূলত ঢাকা বিভাগের পাতাঝরা বন, সিলেট ও চট্টগ্রামের চিরসবুজ বন এবং সুন্দরবনের বাসিন্দা। দিবাচর পাখিগুলো সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। গাছের পুরোনো শ্যাওলাঢাকা কাণ্ডের বাকল উল্টে খাবার খোঁজে। গাছের কাণ্ড আঁকড়ে থাকতে ও ওপরে-নিচে অত্যন্ত দক্ষভাবে চলাচল করতে পারে। সচরাচর একটি শব্দে দৃঢ়ভাবে ‘চিট-চিট-চিট ...’ বা ‘সিট-সিট-সিট ...’ স্বরে ডাকে।
জানুয়ারি থেকে মে প্রজননকাল। এ সময় গাছের ডাল বা কাণ্ডের খোঁড়লে শ্যাওলা, পশম ও পালক বিছিয়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৩-৫টি। রং ধূসর-সাদা, তার ওপর অসংখ্য লালচে-বেগুনি ঘন ছিট-ছোপ। ডিম ফোটে ১৪-১৬ দিনে। ছানারা উড়তে শেখে প্রায় ১৫ দিনে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৪ বছর; সর্বোচ্চ ১০-১২ বছর পর্যন্ত বাঁচার তথ্য রয়েছে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন
ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- পাখি