ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাঁচ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ কারাবন্দি

পাঁচ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ কারাবন্দি
×

ছবি- সমকাল

রাসেল মাহমুদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান চলছে। প্রতিদিন গড়ে এক-দেড় হাজার আসামিকে গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব আসামিকে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। এতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দি এখন কারাগারে। ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বন্দি রয়েছে কারাগারে। তবে কোনো কোনো কারাগারে ধারণক্ষমতার পাঁচ থেকে সাত গুণ বন্দিও রয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে কারাগারে বন্দির সংখ্যার রেকর্ড হয়েছে চলতি মাসে। বর্তমানে কারাবন্দির সংখ্যা এক লাখ পাঁচ হাজার ১২৩ জন। এর আগে গত ২০২৫ সালে কারাগারে সবচেয়ে বেশি বন্দি ছিল ডিসেম্বর মাসে। সেই সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজার ৭১৯। ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ বন্দি ৭৫ হাজার ৯৫৮ জন ছিল জানুয়ারিতে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বোচ্চ ৮৬ হাজার ৩০৬ জন, ২০২২ সালের অক্টোবরে ৮৭ হাজার ১৭৩ জন এবং ২০২১ সালে সর্বোচ্চ জানুয়ারিতে ৮৯ হাজার ৯১৪ জন বন্দি ছিলেন।

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া মাদকের বন্দির সংখ্যাও বাড়ছে। আগে যেখানে ২০-২২ শতাংশ ছিল এখন সেটা বেড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ হয়েছে। এতে বন্দির চাপ বাড়ছে কারাগারগুলোতে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের পর দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা, গুম, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একের পর এক বিশেষ অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চলতি বছরেও এসব অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির ঘটনায় গুলি চালানোর পর ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ‘এস ড্রাইভ’ শুরু করে সিএমপি। এপ্রিলে এক সপ্তাহে দুটি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিশেষ অভিযান চালায় ডিএমপি। এর আগে ২০২৫ সালে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’, সুন্দরবনে দুটি বিশেষ অভিযান, পদ্মার চরাঞ্চলে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ এবং ডিসেম্বরে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ পরিচালনা করা হয়।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, সবশেষ গত ১ মে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। চাঁদাবাজি, মাদক, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও অনলাইন জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এ অভিযানে গত ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মাসে বন্দির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশের ৭৬টি কারাগারে ছিলেন এক লাখ চার হাজার ৬১৭ জন, যেখানে ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। বন্দির সংখ্যার হিসেবে এটি পাঁচ বছরের মধ্যে রেকর্ড। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৭৩২ জন, নারী তিন হাজার ৮৮৫ জন। 

কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় আড়াই গুণ বন্দি রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বন্দি কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। চার হাজার ৫৯০ জনের ধারণক্ষমতার কারাগারটিতে বন্দি রয়েছেন ১৩ হাজার ৯৮৭ জন, যা ধারণক্ষমতার তিন গুণ। তবে সবচেয়ে বেশি বন্দির চাপ ‎শেরপুর জেলা কারাগারে। ১০০ জন ধারণক্ষমতা থাকলেও বন্দি রয়েছেন ৭৪৬ জন। ধারণক্ষমতার প্রায় সাত গুণ বন্দি রয়েছেন সেখানে।

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে বিভিন্ন অপরাধের বন্দি ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ও অন্যান্য সংগঠনের আসামিদেরও রাখা হয়েছে।

সাত কারাগারে ধারণক্ষমতার পাঁচ-ছয় গুণ বন্দি

কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের অন্তত সাতটি কারাগারে বন্দি ‎ধারণক্ষমতার পাঁচ থেকে ছয় গুণ বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ১৫৩ জন থাকলেও বন্দি রয়েছেন ৯৩৬ জন; যা ধারণক্ষমতার ছয় গুণ। ভোলা জেলা কারাগারেও ছয় গুণ বন্দি রয়েছেন। কারাগারটিতে ১০০ জন ধারণক্ষমতা থাকলেও বন্দি আছেন ৬৬৮ জন। ‎নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঁচ গুণ বন্দি রয়েছেন। কারাগারটিতে তিন হাজার ২২ জন বন্দি রয়েছেন। অথচ ধারণক্ষমতা ৫৪০ জন। সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩০৪ জন হলেও বন্দি রয়েছেন এক হাজার ৫৬০ জন। ঝিনাইদহ জেলা কারাগার, রাজবাড়ী জেলা কারাগার এবং চাঁদপুর জেলা কারাগারেও ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ বন্দি রয়েছেন।

‎২০টিতে ধারণক্ষমতার তিন-চার গুণ বন্দি

গাজীপুরের কাশিমপুর-৩ মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ অন্তত ২০টি কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বন্দি রয়েছেন। ‎গাজীপুরের কাশিমপুর-৩ মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ জন বন্দি ধারণক্ষমতা থাকলেও আছেন ৮০০ জন। যা ধারণক্ষমতার চার গুণ। ‎গাজীপুর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতার ৩০৭ জনের বিপরীতে বন্দি রয়েছেন এক হাজার ৩৯০ জন, যা সাড়ে চার গুণ। নাটোর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ২০০ জন হলেও বন্দি রয়েছেন ৯৬৯ জন; সাড়ে চার গুণ। এ ছাড়া ‎বরগুনা জেলা কারাগার, নেত্রকোনা জেলা কারাগার, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার ও বান্দরবান জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার চার গুণ বন্দি রয়েছেন। 

‎ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১সহ ১৩টি কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দি রয়েছেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এ ৫৪৮ জন ধারণক্ষমতা থাকলেও বন্দি রয়েছেন এক হাজার ৯৬২ জন, যা তিন গুণের বেশি। কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতাসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দিদের রাখা হয়। কারাগারটিতে ১০০০ জন ধারণক্ষমতা থাকলেও বন্দি রয়েছেন তিন হাজার ১৭২ জন। ধারণক্ষমতার তিন গুণ। এ ছাড়া ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ বন্দি রয়েছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, কক্সবাজার জেলা কারাগার, ‎টাঙ্গাইল জেলা কারাগার, মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার, জয়পুরহাট জেলা কারাগার, বগুড়া জেলা কারাগার, নরসিংদী জেলা কারাগার, জামালপুর জেলা কারাগার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার ও খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে।

২২ কারাগারে দ্বিগুণ বন্দি

কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ বন্দির ধারণক্ষমতা দুই হাজার। তবে এখন বন্দি রয়েছেন চার হাজার ৭২৪ জন। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি রয়েছেন কারাগারটিতে। এ ছাড়া ফরিদপুর জেলা কারাগার, গোপালগঞ্জ জেলা কারাগার, ‎পাবনা জেলা কারাগার, ‎নওগাঁ জেলা কারাগার, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার, পটুয়াখালী জেলা কারাগার, ঝালকাঠি জেলা কারাগার, হবিগঞ্জ জেলা কারাগার, মৌলভীবাজার জেলা কারাগার, সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার, নড়াইল জেলা কারাগার, মাগুরা জেলা কারাগার, চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগার, মাদারীপুর জেলা কারাগার-১, শরীয়তপুর জেলা কারগার, নোয়াখালী জেলা কারাগার, ফেনী জেলা কারাগার-২, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার ও ‎কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি রয়েছেন।‎

‎কম বন্দি আছেন যেসব কারাগারে 

কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতিসহ ২৩০ জন বিশেষ বন্দিকে রাখা হয়েছে। কারাগারটিতে বন্দি ধারণক্ষমতা ২৭০ জন। এ ছাড়া ধারণক্ষমতার চেয়ে কম বন্দি রয়েছেন যশোর জেলা কারাগার, খুলনা জেলা কারাগার-১, খুলনা জেলা কারাগার-২, ‎কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার ও সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেনা সাব জেলে রয়েছেন ১৭ জন বন্দি।

কারা মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকায় হয়তো অপরাধীরা বেশি গ্রেপ্তার হচ্ছে। পাশাপাশি মাদকের বন্দির সংখ্যা বাড়ছে। তাই কারাগারে বন্দিদের চাপ বাড়ছে। এতে আমাদের তেমন সমস্যা হচ্ছে না। বন্দিদেরও থাকার জায়গা ছাড়া অন্য কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন

×