অতিরিক্ত চাল কিনছে সরকার, চাষির পর ভোক্তাও ক্ষতিগ্রস্ত
ছবি- সংগৃহীত
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুই লাখ টন চাল কিনছে। ইতোমধ্যে এক লাখ ১৫ হাজার টন চালের বরাদ্দপত্র দিতে তালিকা করা হয়েছে। এই বাড়তি ক্রয় সরকার করছে চালকল মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। প্রায় দেড়শ আবেদনের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের আধা-সরকারিপত্র বা ডিও লেটার সংযুক্ত আছে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষকের পর এবার ভোক্তাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
গত বোরো মৌসুমে চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুত করেছেন। তা পরিমাণে এত বেশি যে, বাজারে সরবরাহ করে এবং নির্ধারিত পরিমাণে সরকারি গুদামে চাল দিয়েও উদ্বৃত্ত রয়ে গেছে। সরকার এই বাড়তি চাল কিনতে রাজি হওয়ায় তা সরাসরি বাজারে আসছে না। এই চাল বাজারে এলে খুচরা পর্যায়ে দাম ভোক্তার জন্য আরও সহনীয় হতো।
বোরোর পর আউশ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। আমন ধান মাঠে। কিন্তু সরকার এখন চালকল মালিকদের কাছ থেকে বোরো ধানের চাল কিনছে। এই ক্রয় সরকারের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে।
বোরো মৌসুমে সরকার পাঁচ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল ও এক লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ধান সংগ্রহ হয়েছে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন। সেদ্ধ চাল ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০ টন এবং আতপ চাল এক লাখ সাত হাজার ৬৪৭ টন। অর্থাৎ ধান এবং চাল লক্ষ্যমাত্রার বেশি সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের একটা অংশ বড় কৃষকরা দিয়েছেন। বাকি সব সরবরাহ করেছেন চালকল মালিকরা।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অতিরিক্ত চাল বিক্রির জন্য প্রায় ৮৫০ চালকল মালিক আবেদন করেছেন। এর মধ্যে দেড় শতাধিক মালিক স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধা-সরকারি পত্র বা ডিও লেটার সঙ্গে দিয়েছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৭ টন। সরকারি গুদামের কার্যকর সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ ৯৫ হাজার টন। অর্থাৎ, সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৪৪ হাজার টন বেশি মজুত হয়েছে। এই অবস্থায় আরও প্রায় দুই লাখ টন চাল কেনার আয়োজন শুরু হয়েছে। আগে চাল কেনা হয়েছে ২০ লাখ ২৩ হাজার ২৯৩ টন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান সমকালকে বলেন, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের নীতিটিই এমন যে কৃষক সরাসরি সুবিধা পাওয়ার তুলনায় চালকল মালিকরা বেশি সুবিধা পান। আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাত তুলে সরকারি গুদামে কৃষকের ধান নেওয়া হয় না। তখন কৃষক কম দামে চালকল মালিকদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকার খুব সামান্য ধান কেনে। কিন্তু চাল কেনে অনেক বেশি। চাল সরবরাহ করেন চালকল মালিকরা। ফলে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে চাল তৈরি করে সরকারের কাছে দেওয়ার মধ্যবর্তী পর্যায়ে তাদের লাভের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষককে সুবিধা দিতে হলে তার কাছ থেকেই বেশি পরিমাণে ধান কিনতে হবে।
কম দামে ধান, বেশি দামে চাল
বোরো মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা দরে কিনেছে। ধানের সরকারি সংগ্রহমূল্য ছিল ৩৬ টাকা। ২০২৪ সালের বোরো মৌসুমে সেদ্ধ চালের সংগ্রহমূল্য ছিল ৪৫ টাকা এবং ধান ৩২ টাকা। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় সরকারি সংগ্রহমূল্য বেশি ছিল।
সরকারি সংগ্রহমূল্য বাড়লে বাজারে ধানের দাম কম ছিল। ফলে চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে কিনে মজুত করেছেন। তারা নির্ধারিত পরিমাণ চাল সরকারকে দেওয়ার পরও ধান উদ্বৃত্ত থেকে গেছে। এখন তা চাল করে আবার সরকারের কাছে বিক্রি করছেন। এতে প্রতি কেজি চালে প্রায় তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চাল যদি সরাসরি বাজারে আসত তাহলে সাধারণ ভোক্তা কিছুটা স্বস্তি পেতেন। কিন্তু এমপিদের আধা-সরকারিপত্র যুক্ত করে চালকল মালিকরা বাড়তি চাল সরকারকে দিতে সক্ষম হয়েছে। এতে চালকল মালিকদের মুনাফা হচ্ছে, কিন্তু কৃষকের কোনো লাভ হয়নি। একই সঙ্গে বাজারেও সরবরাহ বাড়েনি।
আউশের দামও কম
বোরোর পর আউশের ফলনও এবার ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়ায় অনেক এলাকায় ধানের দাম কমেছে। নওগাঁর মহাদেবপুরে এখন আউশ ধান প্রতি মণ ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর একই সময়ে দাম ছিল এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।
নওগাঁর মৌসুমি ধান ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান বলেন, গত বছর পরে ধানের দাম এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এবার ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, এ বছর আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪০ লাখ টন ধরা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার আশা করছে সংস্থাটি।
অধিক উৎপাদনের পরও বোরো ও আউশ দুই মৌসুমেই কৃষক ভালো দাম পায়নি। সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায়ও তারা স্থান পাচ্ছেন না। সরকারি গুদামে ধান দিতে কৃষককে নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, নির্দিষ্ট আর্দ্রতার মাত্রা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। এরপর আবেদন যাচাই ও লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়।
খাদ্য অধিদপ্তরের কৃষক-সংক্রান্ত ডিজিটাল ব্যবস্থায় বলা হয়েছে, দেশের সিএসডি ও এলএসডিতে ধান-চালের মজুত এবং লক্ষ্যমাত্রার ঘাটতি তাৎক্ষণিকভাবে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক ও চালকল মালিকের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে বাস্তবে নিবন্ধিত কৃষকের সংখ্যা মোট কৃষক পরিবারের তুলনায় সামান্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা এক কোটি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৭টি। বিপরীতে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য নিবন্ধিত কৃষক ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৩ জন। নিবন্ধিত চালকল ছয় হাজার ৩০১টি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, কৃষকের জন্য সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় নানা শর্ত ও জটিলতা রয়েছে। আর্দ্রতা, পরিবহন, সংগ্রহকেন্দ্রের দূরত্ব এবং অর্থপ্রাপ্তির জটিলতার কারণে কৃষক সরকারি দামে ধান বিক্রি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা দরকার। কৃষকের সন্তানদের মাধ্যমে ডিজিটাল নিবন্ধন ও সরবরাহ প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, আগে কখনোই ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতো না। এবারই প্রথম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। তবে আমাদের আরও সুযোগ থাকায় অতিরিক্ত দুই লাখ টন চাল সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে। স্থানীয়ভাবে যদি সংগ্রহ করা যায় তাহলে বাইরে থেকে আমদানি কম করতে হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়।
বন্ধ মিলও নতুন সরবরাহে
অতিরিক্ত চাল কেনার উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় চুক্তিবদ্ধ কিছু মিলের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল সংগ্রহের সময় যে মিলার এক হাজার টনও চাল দিতে পারেননি, এমনকি যার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ছয় টনের মতো, তিনিও এখন পাঁচ হাজার টন চালের বরাদ্দ চাইছেন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুপারিশ ও চাপ রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কয়েকটি চালকলের সঙ্গে সরকারি চাল সরবরাহের চুক্তি হয়েছে। চান্দাইকোনার আনোয়ারা সেমি অটো চালকল এক যুগের বেশি সময় ধরে বন্ধ। মিলের চাতাল ও ভবন আগাছায় ঢেকে আছে। বিদ্যুৎ সংযোগ, বয়লার বা চাল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। অথচ চলতি বছর ওই মিল থেকে ১১৯ টন চাল কেনার চুক্তি হয়েছে।
একই উপজেলার সৌরভ অটো রাইস মিল, ওমর সেমি অটো রাইস মিল ও লুৎফা অটো রাইস মিল নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও মিলের জায়গা কাঠের গুঁড়া শুকানোর কাজে, কোথাও মুরগি বা গরুর খামার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে রায়গঞ্জের পাঁচটি মিলের লাইসেন্স ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও চুক্তিবদ্ধ মিলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, অনেক মিলারের নিজস্ব মিল বা চাতাল নেই। কেউ ভাড়া করা মিল ব্যবহার করছেন, কেউ অন্যের মিল নিজের নামে দেখিয়ে সরকারি সংগ্রহে অংশ নিচ্ছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন বলেন, চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে সুপারিশ এসেছে। মন্ত্রণালয় থেকেও বলা হয়েছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে এক লাখ ১৫ হাজার টন চালের বরাদ্দপত্র দিতে তালিকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এবার ধানের দাম কম থাকায় সরকারকে চাল সরবরাহ করে মিলাররা লাভবান হয়েছেন। সে কারণে তাদের আগ্রহও বেশি।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও স্বীকার করেছেন, কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে আর্দ্রতাসহ কিছু কারিগরি সমস্যা রয়েছে। কৃষকের সুবিধার জন্য মৌসুম শেষ হওয়ার এক থেকে দুই মাস পর ধান কেনার একটি নীতি করার কথা ভাবছে সরকার। তখন কৃষক ধান শুকিয়ে গোলায় সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং সরকার সরাসরি সেই ধান কিনতে পারবে।
- বিষয় :
- চাল