বিদেশি অনুদাননির্ভর এনজিওর বাজেট কমেছে ৪০ শতাংশ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিদেশি অনুদানের ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই— এমন প্রায় দুই হাজার ২০০ ছোট ও মাঝারি এনজিও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশনির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল। গবেষণায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিও নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ. কে. এনামুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার প্রমুখ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের অর্থায়নের বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুদাননির্ভর এনজিওতেই বেশি ধাক্কা
৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস থাকা এনজিওগুলো তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে। কিন্তু অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস সীমিত। এ কারণে প্রায় দুই হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রথম ধাক্কা পড়তে পারে মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায়। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমিয়ে দিতে বা কর্মী সংখ্যা কমাতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কার্যক্রমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর যোগাযোগ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা কমেছে ২৩ শতাংশ
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা ২৩ শতাংশ কমেছে। এক বছরে সহায়তা সবচেয়ে বেশি কমেছে ওই বছর। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের সহায়তা বাজেট কমানোর কারণে এ সংকটকে সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে এর পুরো প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। কারণ আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনও ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব প্রকল্পে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা কমে গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে দুই হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল। গত অর্থবছরে তা নেমে এসেছে এক হাজার ৬৫৪টিতে। ফলে পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হওয়ার পর অর্থায়নের সংকট আরও বাড়তে পারে।
সরকারি প্রকল্পে এনজিওর যুক্ত করার প্রস্তাব
প্রতিবেদনে সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো— সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহার, সামাজিক ব্যবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।
গবেষকদের মতে, বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩ শতাংশ। ফলে বিকল্পের মধ্যে বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা সরকারেরই রয়েছে। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে এ সুযোগ খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এনজিওগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেবা গ্রহণে মানুষকে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে কিছু সেবা সরকার একা দেওয়ার পরিবর্তে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে দিলে সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।
বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে সিএসআরকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হলেও সেখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ২০২৫ সালে ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে সিএসআর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
যোগ্য এনজিওর তালিকার সুপারিশ
সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, সিএসআরসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
- বিষয় :
- গবেষণা