ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক দলের পরিচালন ব্যয়ে আকাশ-পাতাল ব্যবধান

টিআইবির গবেষণা

রাজনৈতিক দলের পরিচালন ব্যয়ে আকাশ-পাতাল ব্যবধান
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ২২:০৬

রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত আয়ের আনুষ্ঠানিক উৎসের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম ও কার্যালয় পরিচালনার খরচের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। বড় দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখন এক ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হচ্ছে।

আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গবেষণার জন্য ৪২টি দলের (৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ১০টি দল কোনো তথ্য বা সহযোগিতা করেনি। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) রয়েছে। 

৩২টি দলের সার্বিক কার্যক্রম দীর্ঘ মেয়াদে পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে এই গবেষণাটি করা হয়। এতে বিএনপি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্য মিলেছে।  

টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। তবে দলগুলো নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আনুষ্ঠানিকভাবে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়, বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এ অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিনির্ভর বা বিত্তশালীদের অনানুষ্ঠানিক অনুদান হওয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে।

দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যাপ্তি অনুযায়ী পরিচালন খরচ এবং বৈধ চাঁদা আদায়ের সম্ভাব্যতার বৈষম্যমূলক চিত্র তুলে ধরে গবেষণাপত্রে বলা হয়, ইসির শর্তানুযায়ী একটি দলের নিবন্ধন পেতে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলা কার্যালয় এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে হয়। এই কার্যক্রম পরিচালনায় বার্ষিক প্রায় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ সদস্যদের চাঁদা থেকে দলগুলোর সর্বোচ্চ আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা। দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যন্ত সাংগঠনিক কাজের পরিধি বিস্তৃত থাকলে দলগুলোর বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় ৩৩২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। বিপরীতে চাঁদা বাবদ দলগুলোর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য আয় মাত্র ৩৮ কোটি টাকা। তবে যেসব বড় দলের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত দেশজুড়ে সাংগঠনিক ব্যাপ্তি রয়েছে, তাদের বার্ষিক পরিচালন খরচ দাঁড়ায় এক হাজার ৫৩২ থেকে দুই হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। অথচ চাঁদা বাবদ বার্ষিক সম্ভাব্য আয় মাত্র ১১৬ কোটি টাকা।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকা এবং জবাবদিহির ঘাটতির ফলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু সেখানে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল, এমনকি মানুষের প্রাণ দিতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সেটি আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জবাবদিহির অভাবে বাড়ছে পরিবারতন্ত্র 

গবেষণায় দেখা গেছে, দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। ৩২ রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৪টি দলের নিজস্ব ওয়েবসাইট থাকলেও মাত্র ১৬টির ওয়েবসাইট সচল রয়েছে। দলগুলোর ডিজিটাল ও অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার অভাবের কারণে রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিকতার গভীরতা ক্রমাগত বাড়ছে। এই ৩২ দলের মধ্যে ১৬টি দলেই নিয়মিত জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় না। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সম্মেলন ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হয় না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃণমূল থেকে যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসার পথ বাধাগ্রস্ত করে দেশের অন্তত ১০টি প্রধান দলের শীর্ষ পদ সরাসরি পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তৃণমূল, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মানুষ ও নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে নেতৃত্ব বিকাশে পরিবারতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। আইনি বাধ্যবাধকতা ও দলগুলোর অঙ্গীকার থাকার পরও মূল নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অবস্থান শুধু নামমাত্র বা প্রতীকী হিসেবে আটকে আছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে দলগুলোর মধ্যে তীব্র কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ সহিংসতা বাড়ছে। গত ১৩ বছর আট মাসে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও একচেটিয়া আধিপত্যের জেরে দেশে মোট চার হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নিজেদের ভেতরের কোন্দলের কারণে এক হাজার ৯২৬টি সহিংসতায় ৩১৮ জন প্রাণ হারান। এই সময়ে ৭৪৬ জন রাজনৈতিককর্মী নিহত এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরেই ৩১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৮ হাজার ৪৯১ জন গুরুতর আহত হন। ক্ষমতার এই সহিংস চর্চা সমাজে এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, আইন ও বিধিমালা থাকার পরও দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর চর্চারও অসামঞ্জস্য রয়েছে। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেশের চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই অতি নিয়ন্ত্রণমূলক। অন্যদিকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের কার্যকর পদ্ধতির অনুপস্থিতির কারণে আইনি ব্যবস্থা অঙ্কুরেই অর্থনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি করে। 

১২ দফা সুপারিশ

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা ও মনোযোগ দেওয়া হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য।

দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারসহ ১২ দফা সুপারিশের মধ্যে রয়েছে– দলগুলোর যাবতীয় তহবিলের উৎস, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং করপোরেট ফান্ডিং তদারকি করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়ন, বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ, বার্ষিক আয়-ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব বিবরণী ও বহির্নিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত অডিট রিপোর্ট ইসির পাশাপাশি নিয়মিত দলীয় ওয়েবসাইটে এবং সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা, অপরাধী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপিদের অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে গঠনতন্ত্রে নৈতিক আচরণবিধি যুক্ত করা এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্দিষ্ট সময়ে দলের জাতীয় সম্মেলন বা কাউন্সিল নিশ্চিত করা। 

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মূল দায়িত্ব দলগুলোকেই নিতে হবে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে নেতাদের নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে। সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

আরও পড়ুন

×